রোববার, ২৫ জুন ২০১৭, ১১ আষাঢ় ১৪২৪, ৩০ রমজান, ১৪৩৮ | ০৬:৫৭ পূর্বাহ্ন (GMT)
ব্রেকিং নিউজ :
X
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ ০৭:৩৩:২৭ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

সাংস্কৃতিক দূষণ প্রাসঙ্গিক কথা

শাহ আব্দুল হান্নান

 

 

 

 

বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্টে দেখা গেছে, উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে ভালোবাসা দিবসের নামে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ পালিত হলো। ফুল, কার্ড, উপহারসামগ্রী ও মেসেজ প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধু-বান্ধব, বিবাহিতরা বিতরণ করে থাকেন এই দিনে। শত শত মানুষকে এই দিনটি বিশেষভাবে পালন করতে দেখা গেছে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় তাদের সমবেত হয়ে উৎসব করতেও দেখা যায়। দিনটি উপলক্ষে তারা বিশেষ রঙিন পোশাক পরে বর্ণিল সাজে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিলেন। ভালোবাসার নামে এই দিবস উপলক্ষে তরুণ-তরুণীদের বেশি উৎসাহী দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে সমবেত হয়ে অনুষ্ঠান করে দিনটি উদযাপন করতে দেখা গেছে। ধানমন্ডি লেকসহ রাজধানীর বিভিন্ন ডেটিংয়ের স্থানে তরুণ-তরুণীদের সরব উপস্থিতি থাকলেও ভ্যালেন্টাইন ডে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছিল। ভার্সিটি ক্যাম্পাসের টিএসসি, বকুলতলা, চারুকলা ইনস্টিটিউট, বটতলার নামই এ উপলক্ষে পত্রপত্রিকায় বেশি এসেছে। ক্যাম্পাসের সব স্থানেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত বইমেলাতেও ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে তরুণ-তরুণীদের উৎসবমুখর উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করার মতো। ছেলেদের পরনে টি শার্ট, মেয়েরা হলুদ-কমলার সমন্বয়ের শাড়ি পরা। তাদের অনেকের গায়ে, হাতে-মুখে উলকি দেখা যায়। এ সব কিছুর মধ্য দিয়ে তারা তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করেছে বলে মনে করে। দিনটি উপলক্ষে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উদযাপন পরিষদ’ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেছিল। দিনটি উপলক্ষে কনসার্টের আয়োজনও একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়িকভাবে দিনটিতে নানা ধরনের পণ্য বিক্রি হতে দেখা যায়।
বিভিন্ন পত্রিকার খবর থেকে এটুকু আমি নিয়েছি। এভাবেই আমাদের দেশের কোথাও কোথাও ভালোবাসা দিবস হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে পালন হতে দেখা যায়। তবে দেশের সাধারণ জনগণকে দিনটি পালন করতে দেখা যায়নি। এই দিন উপলক্ষে বাবা-মায়ের প্রতি, গরিবদের বা বঞ্চিতদের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। একজন সম্পাদক একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, এই দিনটিতে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে, প্রতিপক্ষ দল ও গ্রুপ ইত্যাদির মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এর কিছুই দেখতে পাইনি। আসলে সেটা কারো কারো দিবাস্বপ্ন। প্রকৃতপক্ষে দিনটি পালনের মূল অংশ বা উদ্দেশ্যই হচ্ছে, অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করা, অবিবাহিতদের অবাধ মেলামেশা আর কিছু মুনাফাজনক পণ্যের বিক্রি বাড়ানো। এগুলোর পেছনে ব্যবসায়ীদের মুনাফার বিষয়টি মুখ্য বলে পরিগণিত হয়। এখানে লন্ডনের ইমপ্যাক্ট ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকায় প্রকাশিত ড. খালিদ বেগের ভ্যালেন্টাইন ডের ওপর লেখার কিছু অংশ উল্লেখ করা যায়, ‘বিজাতীয় সংস্কৃতি চর্চা করছে যেসব মুসলমান, তাদের বেশির ভাগই জানে না যে, আসলে তারা কী করছেন। তারা অন্ধভাবে অনুকরণ করছেন তাদের সাংস্কৃতিক নেতৃবর্গকে, যারা তাদের মতোই অন্ধ। যাকে নির্দোষ আনন্দ মনে করা হচ্ছে, তার শেকড় যে পৌত্তলিকতায় প্রোথিত হতে পারে, এটা তারা বোঝেনই না। আর যে ধ্যানধারণা তারা ধার নিয়েছেন তা হতে পারে কুসংস্কার। এ সব কিছুই ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।’
ভালোবাসা দিবসের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা দিবসের উৎপত্তি নিয়ে কাহিনী-কিংবদন্তি প্রচুর। এটা স্পষ্ট, খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে রোমানরা এটা শুরু করেছিল পৌত্তলিক পার্বণ হিসেবে। ‘উর্বরতা ও জনসমষ্টির দেবতা’ লুপারকাসের সম্মানার্থেই এটা করা হতো। ... এর প্রধান আকর্ষণ ছিল, লটারির মাধ্যমে যুবতীদের ওই দিন যুবকদের মধ্যে বণ্টন করা হতো পরবর্তী বছরের জন্য। পরের বছর লটারি না হওয়া পর্যন্ত যুবকেরা ওই সুযোগ পেত। আরেকটি ঘৃণ্য প্রথা ছিল, যুবতীদের প্রহার করা। ছাগলের চামড়া দ্বারা স্বল্পবসন পরা দুই যুবক একই চামড়ার বেত দিয়ে এই নির্যাতন চালাত। ছাগল ও কুকুরের রক্তে ওই যুবকেরা রঞ্জিত হতো। তাদের প্রহার খেলে যুবতীরা আরো ভালোভাবে গর্ভধারণ করতে পারবে বলে বিশ্বাস করা হতো।’
পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টধর্ম এটাকে পৌত্তলিকতা ও অনৈতিকতা থেকে উদ্ধার করার ব্যর্থচেষ্টা করে। তারা কেবল লটারির নাম পরিবর্তন ছাড়া আর কিছুই করতে সক্ষম হলো না। একজন সাধুর নামে লটারির নাম করা হতো যাতে এসব যুবক-যুবতী ওই সাধুর মতো চরিত্রবান হয়। এ দিবসের পূর্বনাম ‘লুপারক্যালিয়া’ থেকে বর্তমান নাম ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ হয়েছে। গেলাসিয়াস নামের পোপ ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে এটা করেছিলেন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের সন্ন্যাসীর সম্মানার্থে। তবে ৫০ জন ভ্যালেন্টাইনের কথা বিভিন্ন কাহিনীতে পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে মাত্র দু’জন সমধিক পরিচিত। অবশ্য তাদের জীবন ও আচরণ রহস্যাবৃত। আরো জানা যায়, লটারি নিয়ে মারাত্মক সঙ্কট দেখা দেয়ায় ফরাসি সরকার ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ভ্যালেন্টাইন দিবস নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। এ দিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একপর্যায়ে ইতালি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানি থেকে দিবসটি বিদায় নেয়। সপ্তদশ শতকে পিউরিটানরা খ্রিষ্টানরা বেশ প্রভাবশালী ছিল, তখন ইংল্যান্ডেও ভালোবাসা দিবস নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরে রাজা দ্বিতীয় চার্লস আবার এটি পালনের প্রথা চালু করেন। ইংল্যান্ড থেকে ভ্যালেন্টাইন গেল ‘নতুন দুনিয়া’য় এবং এটা এখনকার অর্থাৎ আমেরিকা। সেখানে উৎসাহী মার্কিনি বা ইয়াঙ্কিরা পয়সা কামানোর বড় সুযোগ খুঁজে পেল এর মাঝে।’ ক্রমে ক্রমে এটা ব্যবসা ও মুনাফা অর্জনের দিবসে পর্যবসিত হয়েছে। কাজেই আমরা দেখতে পাই; ভালোবাসা দিবস নিয়ে যে সংস্কৃতি দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই আমাদের সংস্কৃতি হতে পারে না। পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারের ওপর ভিত্তি করে মুনাফার উদ্দেশ্যেই এর প্রচলন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা দেখতে পাচ্ছি, দিবসটি ক্রমেই বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের একটি হাতিয়ারেই পরিণত হচ্ছে। তদুপরি এর মাধ্যমে অবৈধ মেলামেশার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা আমাদের সমাজের একটি অংশকে কার্যত ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অবশ্যই এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সচিব, বাংলাদেশ সরকার

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর