শুক্রবার, ২০ অক্টোবর ২০১৭, ৫ কার্তিক ১৪২৪, ২৯ মুহাররম, ১৪৩৯ | ০৪:১৩ অপরাহ্ন (GMT)
ব্রেকিং নিউজ :
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
রোববার, ০৬ আগস্ট ২০১৭ ০৪:০৯:১৪ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

রাজনীতিতে আশা-নিরাশা, সংসদ ভাঙার নির্দেশ এলে কী করবে সরকার ও বিরোধীপক্ষ?

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে ঘিরে যেমন শাসন ও বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের অপ্রকাশ্য টানাপোড়েন এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রায়ের পর্যবেক্ষগুলোকে ঘিরেও সরকার ও বিরোধী পক্ষে চলছে তুমুল বাকযুদ্ধ। আদালতের রায়ে যেসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে তাতে সরকারে অস্বস্তি দেখা দেওয়াটাও স্বাভাবিক। আর এতে সরকার যে কঠিন চাপের মুখে পড়েছে তা মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের বক্তব্য থেকেই দৃশ্যত হচ্ছে। সরকার পক্ষ এ রায়ের সমালোচনা করলেও বিরোধী পক্ষ এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যায়িত করে সরকারকে পদত্যাগেরও আহ্বান জানিয়েছে। শুধু তাই নয়, রায়ের পর্যবেক্ষণে বর্তমান সংসদকে ‘অকার্যকর’ বলে মন্তব্য করায় সংসদ ভেঙে দেয়ার দাবি তুলে আদালতে রিটের চিন্তাভাবনাও করছে বিরোধীপক্ষ। তবে সরকার পক্ষ বিরোধী পক্ষের পদত্যাগের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন ‘কেউ কেউ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ায় মহাখুশি। খুশিতে লাভ নেই এই আশার আলো অচিরেই নিভে যাবে।’ তবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কিছুটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, আদালতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী যতোবার বাতিল করা হবে, ততোবারই সংসদে বিল পাস করা হবে। তিনি এও বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী যারা বাতিল করেছেন, সেসব বিচারপতির চাকরিও সরকার দেয়। তাই আদালতে বাতিল করা হলেও সংসদে তা বার বার পাস করা হবে।’ অবশ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে দলীয় নয় বলে উল্লেখ করেছেন। তারা পুরো রায় পর্যবেক্ষণের পর দলীয় প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা বলছেন। তবে বিএনপি নেতারা গেল কয়েকদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে আসছে। এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য আদালত অবমাননার সামিল ও অশুভ ইঙ্গিত। তিনি বলেন, ষোড়শ সংশোধনী রায়ের পরে সরকারের ক্ষমতায় থাকা বেআইনি। এ রায়ের পরে দেশের জনগণ আশা খুঁজে পাচ্ছে। ফলে সরকারের উচিত পদত্যাগ করে বিদায় নেয়া। রিজভী এও বলেন, লজ্জা থাকলে তারা এই রায়ের সমালোচনা না করে পদত্যাগ করে বিদায় নিতেন। কিন্তু তাদের কথাবার্তায় বুঝা যাচ্ছে- তারা ক্ষমতার মোহে সেই লজ্জাবোধও হারিয়ে ফেলেছেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যবেক্ষণের পর সরকারের ক্ষমতায় থাকার আর কোনো নৈতিক অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানান তিনি। ফখরুল এও বলেন, সভ্য দেশ হলে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর সরকার পদত্যাগ করত। সরকারের উচিৎ রায় আমলে নিয়ে অবিলম্বে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়া। এদিকে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের ‘ঐতিহাসিক’ রায় পর্যালোচনা করছে বিএনপি। দলটির সিনিয়র আইনজীবীরা শনিবার দুপুরে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, রায়ে বর্তমান সংসদকে ‘অকার্যকর’ বলে মন্তব্য করায় সংসদ ভেঙে দেয়ার দাবি তুলতে পারে বিএনপি। এর পরিপ্রেক্ষিতের আদালতে রিটও করা হতে পারে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জমির উদ্দিন সরকার, জয়নুল আবেদিন, মীর নাসির উদ্দিন, নিতাই রায় চৌধুরী, এ জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, মাসুদ আহমেদ তালুকদার প্রমুখ। বৈঠক শেষে এক নেতা জানান, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ঐতিহাসিক। পূর্ণাঙ্গ রায় আমরা স্টাডি করছি। রায়ে বর্তমান সংসদকে ‘ডিসফাংশনাল’ (অকার্যকর) বলা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনী কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ওই নেতা বলেন, বর্তমান সংসদে ১৫৩/১৫৪ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধানের ৬৫/২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী- জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যগণ। সেক্ষেত্রে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ওই নির্বাচনে এর সম্পূর্ণ ব্যতয় ঘটেছে। এখন যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংসদে অকার্যকর বলেছে, সেহেতু আইনী পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে তারা চিন্তাভাবনা করছেন। সংসদ ভেঙে দেয়ার বিষয়ে রিট করাও হতে পারে। এদিকে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ শনিবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ অভিহিত করে বলেন, এ রায় দেশের ১৬ কোটি মানুষের মনের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছে। এ রায় জাতীয় দলিল বলে আমরা আখ্যায়িত করতে পারি। এখন আসা যাক, ষোড়শ সংশোধনী কী এবং আদালতের রায়ে কী বলা হয়েছে- বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়। ‘বিচারকদের পদের মেয়াদ’-সংক্রান্ত ষোড়শ সংশোধনী বিল অনুসারে, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২ দফায় বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতাসংক্রান্ত বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘প্রমাণিত ও অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাবে না।’ ৩ দফায় বলা হয়েছে, এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন প্রস্তাব-সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করবে। একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। পরে ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই বছরের ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের নয়জন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ৫ মে হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ গত ৪ জানুয়ারি আপিল করে। আপিলের ওপর গত ৮ মে শুনানি শুরু হয়, যা ১১তম দিনে গত ১ জুন শেষ হয়। ওই দিন আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। গত ৩ জুলাই রায়ের সংক্ষিপ্তসার ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। সবশেষ গত ১ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত করা হয়। ওইদিন পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়। রায়: পূর্ণাঙ্গ রায়ে সংবিধোনের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ বলে বাতিল ঘোষণা করে আদালত। এর ফলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে থাকছে না। এছাড়া আপিল বিভাগের যে পূর্ণাঙ্গ রায় বেরিয়েছে, তাতে আদালত কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। পর্যবেক্ষণগুলোর সারাংশ করা হলে সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়, আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে- দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই, এদেশে পার্লামেন্টে নন ফাংশনাল হয়ে গেছে, দেশে আইনের শাসন নেই এবং বিচার বিভাগকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। পর্যবেক্ষণে এও বলা হয়েছে যে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়া এখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয়। ফলে বলা যায়, আদালতের এ সব পর্যবেক্ষণ পুরোটাই সরকারের প্রতিকূলে গেছে। আর এতেই বিরোধীদের নতুন আশা সঞ্চার করেছে। তাই তারা সরকার তথা সংসদের বৈধতা নিয়ে রীটের চিন্তাভাবনা করছে। ধরে নেওয়া যাক, এমতাবস্থায় সত্যিই বিরোধীপক্ষ সরকারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রীট করেই ফেলল, আর তাতে আদালত সংসদ ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে দিল তবে কী ঘটতে পারে দেশের রাজনীতিতে এমন ভাবনাও চলছে রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী মহলে। তাদের মতে, এমন নির্দেশ যদি আদালত থেকে এসেই যায় তবে সরকার যে সহজেই রায় মেনে নিয়ে সংসদ ভেঙে দিবে এমনটি চিন্তা করার সুযোগ খুবই ক্ষীণ। কেননা, আদালতের নির্দেশে সংসদ ভাঙার নজীর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থাকলেও আমাদের দেশে নেই। আর আমাদের দেশে সে ধরনের গণতান্ত্রিক শ্রদ্ধাবোধ কিংবা আইনের শাসনও গড়ে উঠেনি। ফলে এ ধরনের আশা অর্থহীন বলেও মনে করেন অনেকে। তবে এ ধরনের একটি রায় হয়ে গেলে এক্ষেত্রে সরকার কী ধরনের সুযোগ নিতে পারে সে ভাবনাও কম নেই বোদ্ধামহলে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র দেড় বাকী। এরমধ্যে আদালত থেকে সংসদ ভাঙার নির্দেশ এসে গেলে সরকার আপিলে যেতে পারবে। আর সেই আপিল শুনানি বারবার পিছিয়ে সহজেই দেড় বছর কাটিয়ে দিতেও সক্ষম হবে সরকার পক্ষ। কেননা, এ ধরনের প্র্যাকটিসের নজীর অনেক রয়েছে। যেমনটি উল্লেখ করা যেতে পারে- নিম্নআদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়নের বিষয়টি সরকারপক্ষ কতবার যে সময় নিয়েছে এর কোনো ইয়ত্তা নেই। তাই সবশেষে বলবো, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে বিরোধী পক্ষে যে আশার সঞ্চারের কথা বলা হচ্ছে তা সাময়িক তৃপ্তিদায়ক হলেও আখেরে এর ফলাফল শূণ্য বলেই প্রতীয়মান হতে পারে। কেননা, আমাদের দেশে সেধরনের নজীর নেই। ফলে ক্ষমতা পরিবর্তনের স্বপ্ন পূরণের ফয়সালা রাজনীতির মাঠেই হতে হবে, বিচারালয়ে নয়। তবে এটা সত্য যে- বিরোধীপক্ষ যদি রীটের মাধ্যমে আদালত থেকে সংসদ ভাঙার নির্দেশ আনতে পারে তবে সেটা একটা ভিন্ন নজীর হয়ে থাকবে। যা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ফলে এ রায়ের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় তা দেখতে আমাদেরকে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর