সোমবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ৮ কার্তিক ১৪২৪, ২ সফর, ১৪৩৯ | ১১:৩২ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
বৃহস্পতিবার, ১০ আগস্ট ২০১৭ ০৫:৪৯:০১ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

হাওরের চার শিশুর দিনরাত্রি

বুকের হাড়গুলো যেন এক একটি করে গোনা যায়। এই হাড়গুলোই মনে করিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে তাদের জীবনের দিনগুলি। মাঝে মাঝে ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিন শিশু প্রায়ই তার বড় ভাইকে কান্নার সুরে বলে থাকে, ‘ভাইয়া, ক্ষুধা পেয়েছে? ভাত খাব।’ শিশু তিনটির বড় ভাইয়ের বয়স ১১ বছর। যে কিনা নিজেই ক্ষুধা পেটে রাত-দিন ঘুরে বেড়ায়। সে-ই ছোট তিনটি শিশুর অভিভাবক! তার নাম মনির হোসেন। আর ছোট্ট তিন ভাইয়ের নাম তোফাজ্জল (৯), আমির হোসেন (৭) ও নয়নমনি (৫)। এদের বাস সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার লম্বাবাক গ্রামে। ইউনিয়নের নাম জামালগঞ্জ উত্তর। এই শিশুদের বাবা রবিউল আউয়াল। একসময় সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন আউয়াল। রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। তবে ছয় বছর আগে তাঁর মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে। কোনো দিন বাড়িতে আসতেন, আবার কোনো দিন আসতেন না। পরে তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। সেই থেকে তিনি কোথায় আছেন, কীভাবে আছেন, কেউ জানে না। এখন মনিরদের কাছে বাবা মৃত। বাবা নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর মা কাজলী বেগম এলাকায় বিভিন্ন বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে তাঁদের সংসার চালাতেন। ছেলে মনিরকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেন। অভাব-অনটনের মধ্যে কেটে যেতে থাকে তাঁদের জীবন। তবে তিন বছর আগে হঠাৎ তাদের মা-ও একদিন নিরুদ্দেশ হন। মাস ছয়েক পরে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে মা মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। তখন মনিরেরা জানতে পারে, তাদের মা বেঁচে আছেন। ঢাকায় থাকেন। এরপর থেকে দুই তিন মাস অন্তর মুঠোফোনে তাদের খোঁজ নিতেন মা। আর মাস সাতেক আগে তিনি একদিন ফোন করে জানান, তিনি কাজের জন্য সৌদি আরব গেছেন। এরপর মাস ছয়েক আগে শেষবার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় মনিরদের। আর কোনো খবর নেই। মা নিরুদ্দেশ হওয়ার পর থেকে মনিরদের নিদারুণ কষ্টের শুরু। তাদের নানি এখনো বেঁচে আছেন। নানি জুলেখা মানসিকভাবে অতটা শক্তপোক্ত নন। তারপরও এই নানিই তাদের বেঁচে থাকার আশ্রয়। নানিই পরের বাড়িতে কাজ করে যে বেলা খাবার পান, সেই বেলা মনিরদের পেটে দানা পড়ে। মনিরদের কেবল ক্ষুধার যন্ত্রণাই নয়, পরের বাড়িতে থাকতে হয়। এলাকার শমসের আলী নামের একজন তাঁর কুঁড়েঘরে তাদের থাকতে দিয়েছেন। গত পাঁচ বছর ধরে সেই ঘরেই তাদের বসবাস। মাটির ঘর। দরজা নেই। ঘরে কোনো খাট নেই। ঘরের কোনায় গড়াগড়ি খাচ্ছে একখানা থাল। অভাবে থাকতে থাকতে লেখাপড়া মনে ধরে না মনিরের ছোট ভাই তোফাজ্জলের। বাড়ির কাছে স্কুল। কিন্তু স্কুলের ভেতরে ছাত্র হয়ে বসার সৌভাগ্য হয়নি। দিন কাটে হাওরের জলে। তার আছে একখানা মাছ ধরার জাল। সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সেই জাল নিয়ে সোজা চলে যায় হালির হাওরে। তাদের বাসা থেকে খুব কাছেই। মাছ ধরে সে বাজারে বিক্রি করে। আয় হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা। সেই টাকায় কেনে চাল, আটা। আগে হাওরে ধানের সময় তোফাজ্জল হাওর ঘুরে ঘুরে ধান কুড়াত। কাজও করত। কিন্তু গেল চৈত্র মাসের হাওরের ফসলডুবিতে ধানের পর মাছেরও আকাল। ছোট্ট নয়নমনির শরীরে একধরনের ঘায়ের মতো হয়েছে। বুকের বাঁ পাশ থেকে সেই ঘা এখন ছড়াচ্ছে সারা দেহে। রাত হলে কেবল চুলকায়। আর কেবলই কান্নাকাটি করে। এক সপ্তাহ ধরে তার জ্বর। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে তার যাওয়া হয়নি। মনিরদের সেই টাকা নেই। মনিরদের থেকে যাদের অবস্থা ভালো, তারা পেয়েছে সরকারি সহযোগিতা। অথচ মনিরদের কপালে জোটেনি কোনো ত্রাণ। মনিরও জানে, সরকার থেকে দরিদ্রদের মাসে ৩০ কেজি চাল আর ৫০০ করে টাকা দিয়েছে। এত কষ্ট, এত যন্ত্রণা, এত দুঃখের পরও মনির স্বপ্নে দেখে, একদিন সে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। স্কুল পেরিয়ে কলেজে পড়বে। আর ছোট্ট ভাইদের পাশে থাকবে। সে বলছিল, ‘আমরা তিনবেলা খেতে পারি না। জামাকাপড়ও তেমন নেই। আমি লেখাপড়া করতে চাই।’ মনির ছেলেটির লেখাপড়ার এত আগ্রহ দেখে তার খাতা-কলম কিনে দেন তার স্কুলের এক শিক্ষিকা। নাম তাঁর জেসমিন আক্তার। পূর্ব লম্বাবাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তিনি। চার শিশুর ক্ষুধার যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার কথা বলতে গিয়ে তিনিও আবেগতাড়িত হন। তিনি বলেন, ‘এদের বড়ই ক্ষুধার যন্ত্রণা।’ জামালগঞ্জের এই চার শিশুর এসব কষ্টের দিনরাত্রির খবর জানেন না স্থানীয় চেয়ারম্যান রজব আলী। তাঁর ভাষ্য, এলাকা অনেক বড়। এবারই প্রথম তিনি চেয়ারম্যান হয়েছেন। এখন তিনি তাদের খোঁজ নেবেন। মনিরদের ক্ষুধার যন্ত্রণায় থাকার কথা যখন জামালগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরুল হাসানকে জানানো হয় তখন তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার নিজে একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে নিয়ে মনিরদের দেখতে যাবেন। আর তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করবেন।

আরো খবর