বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৭, ৬ মাঘ ১৪২৩, ২০ রবিউস সানি , ১৪৩৮ | ০৩:০০ অপরাহ্ন (GMT)
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ১২:৫৭:৪২ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

বিশ্বসাহিত্যিকদের পাগলামি

সৃজনশীল মানুষের ক্ষ্যাপাটে স্বভাব নতুন নয়। সাধারণের চোখে যেটি আস্বাভাবিক, উদ্ভট তাদের কাছে যেন তাই স্বাভাবিক। এ কারণেই তারা ব্যতিক্রম। পাশ্চাত্যসাহিত্যে যৌনতা বহুবার, বহুভাবে এসেছে। বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত সব লেখকদের জীবনাচারণে যৌনতা কীভাবে এসেছে বা এর দ্বারা তাদের লেখনী কতটা প্রভাবিত হয়েছে এ নিয়েই এই লেখা। লিখেছেনমিলন আশরাফ। 
আমি আসলে কোন হৃদয়সম্পন্ন নারীর সঙ্গে সঙ্গম করতে চাইছিলাম : জেমস জয়েস
ইংরেজি সাহিত্যের মহান পুরুষ জেমস জয়েস। ‘ইউলিসিস’ তার অমর সৃষ্টি। উপন্যাসটি ১৯২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডে অশ্লীলতার দায়ে নিষিদ্ধ হয়। উপন্যাসে জেমস জয়েস ১৬ জুন দিনটিকে স্মরণীয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উপন্যাসের মতো তার ব্যক্তিগত জীবনেও এই দিনটির বিশেষ তাৎপর্য আছে। এই তারিখে জেমস নোরা বারনাকলের প্রেমে পড়েন। তার বয়স তখন মাত্র ২৩। স্বল্পশিক্ষিত নোরা ছিলেন হোটেল পরিচারিকা। নোরা জয়েসের ঘনিষ্ঠ ছিলেন কিন্তু তিনি একজন পাদ্রীকে বিয়ে করতে মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। তখন জেমস তাকে ‘কমন-ল’ ওয়াইফ হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯০৪ সালে জেমস জয়েস নোরাকে নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমান। উদ্দেশ্য চাকরি। পরে ১৯৩১ সালে মেয়ে লুসিয়ার জোরাজুরিতে জয়েস ও নোরার বিয়ে হয়।
ছাত্রজীবন থেকেই জয়েস ডাবলিনের নোংরা বেশ্যাপল্লীতে ঘুরতেন। ১৪ বছর বয়সে তিনি প্রথম নারীর সংস্পর্শে আসেন। ২০ বছর বয়সে তিনি পতিতালয়ে যাওয়া বন্ধ করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমি আসলে কোন হৃদয়সম্পন্ন নারীর সঙ্গে সঙ্গম করতে চাইছিলাম।’ এখানে উল্লেখ্য যে, নোরা বারনাকলই ছিলেন তাঁর দেখা প্রথম হৃদয়সম্পন্ন নারী। অথচ জয়েসের চেহারা তখন ছিল বালক সুলভ। সেজন্য নোরা তাকে ‘সুবোধ জিম’ বলে ডাকতেন। অন্যদের কাছে নোরা তাকে দুর্বল বলে বর্ণনা করতেন। লেখক হিসেবে জয়েস যখন বিশ্বখ্যাতি লাভ করেছিলেন তখনও নোরা তার প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন। 
নারী মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের কারণে ‘ইউলিসিস’ নাম করেছিল। অথচ জেমস জয়েসকে লক্ষ্য করে নোরা বলতেন, ‘ও মেয়েদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না’। তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করলেও নোরা আজীবন জয়েসের প্রতি আন্তরিক ছিলেন। জয়েস নোরাকে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিছানায় যেতে বলতেন। তাহলে নাকি তিনি লেখার কিছু উপকরণ সংগ্রহ করতে পারবেন- নোরা তার বন্ধুদের কাছে এসব গল্প করতেন।
মেয়েদের অন্তর্বাসের প্রতি জয়েসের তীব্র আকর্ষণ ছিল। এমনকি তিনি পকেটে এগুলো রেখে দিতেন। যখন তিনি বার-এ যেতেন তখন প্রায়ই সেগুলো আঙুলে রেখে নর্তকীর ছন্দে নাচাতেন। অন্যরা তখন তার এই পাগলামি অবাক বিস্ময়ে উপভোগ করতো।
প্যারিসে থাকাকালীন জয়েস আমালিয়া পপ্পা নামের এক ধর্নাঢ্য ইহুদি সওদাগরের কন্যার প্রেমে পড়েন। কিন্তু ওটা ছিল একতরফা। সওদাগর নিজেই ভদ্রভাষায় জয়েসকে জানান- লেখক যেন তার সুনামের বদৌলতে মেয়েটির কোন ক্ষতি না করেন। আমালিয়ার মধ্যে জয়েস কালো চামড়ার সেমিটিক রমণীর ক্ষুধা অনুভব করেন। ১৯১৯ সালের শুরুতে জুরিখে মার্থে ফ্লাইশমান নামে এক তরুণীকে দেখে জয়েসের ওই একই অনুভূতি হয়েছিল।  ধারণা করা হয়, অল্প বয়সে পতিতালয়ে যাওয়ার কারণে জয়েস সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হন। শুধু তাই নয়,বলা হয়ে থাকে, তার ক্রনিক চোখের অসুখের কারণও ওই সিফিলিস।
আমি এমন পুরুষ এবং মহিলা দেখতে চাই, যারা সৎ, স্বচ্ছ এবং পরিষ্কারভাবে যৌন চিন্তা করে :  ডি. এইচ. লরেন্স
ডেভিড হারবার্ট লরেন্স। আমরা সবাই তাকে ডি. এইচ. লরেন্স নামে চিনি। যৌনতা অবলম্বন করে বলিষ্ঠ সাহিত্য তার সমকালে আর কেউ রচনা করেনি। খোলাখুলি যৌন ঘটনাবলীর বর্ণনা দেওয়া থাকতো তার লেখায়। যে কারণে তার অধিকাংশ বই নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯২০ সালে তার ‘উইম্যান ইন লাভ’ উপন্যাসটি গোপনে ছাপা হয়। ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ও তার আলোচিত উপন্যাস। সেখানে সঙ্গম দৃশ্যের এমন খোলামেলা দুঃসাহসিক বর্ণনা আগে কেউ দেননি। দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকার পর ১৯৬০ সালে পরিমার্জন করে বইটি পুনরায় প্রকাশিত হয়। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৮ সালে। লরেন্স তার উপন্যাসগুলোতে দেখাতে চেয়েছেন জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের মূলে রয়েছে যৌনশক্তি। 
বাল্যকালে লরেন্স প্রথম প্রেমে পড়েন ফেসিয়া চেম্বারস নামক এক মেয়ের। এই প্রেম এবং একে ঘিরে মায়ের সঙ্গে টানাপোড়েনের ব্যক্তিগত কাহিনি আমরা তার ‘সন্স এ্যান্ড লাভার’স’ উপন্যাসে দেখি। এরপর এক বিবাহিত মহিলা এলিস ডাস্কের সাথে লরেন্সের প্রথম যৌন সম্পর্ক হয়। এই মহিলাই প্রথম যৌনতা সম্পর্কে লরেন্সকে কৌতূহলী করে তোলেন এবং তার সৃজনশীল চিন্তাধারার সলতেতে আগুন ধরিয়ে দেন। ১৫-এর কোঠায় এসে লরেন্স লুই বরোজ নামের এক সুন্দরীর প্রেমে পড়েন। যার ফলে আগের সম্পর্কের ছেদ ঘটে।
উল্লিখিত তিন নারীই লরেন্সের ক্ষ্যাপাটে জীবনের পাগলামিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কিন্তু লরেন্স ওদের জীবনে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। প্রমাণ হিসাবে আমরা দেখতে পাই, ফেসিয়া চেম্বারস অবিবাহিতা থেকে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেন। এলিস ডাস্কও  সারা জীবন পথ হেঁটেছেন লরেন্সের উজ্জ্বল স্মৃতি হৃদয়ে ধারণ করে। আর লুই বরোজ বিয়ে করেছিল লরেন্স মারা গেলে। 
১৯১২ সালে লরেন্স উইক্নির প্রেমে পড়েন এবং উভয়ই পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। এরপর লরেন্সের সঙ্গে পরিচয় হয় অভিজাত জার্মানি মহিলা ফ্রিদার। তিন সন্তানের জননী, সুন্দর দেহপল্লবীর এই রমণী লরেন্সের চেয়ে ৬ বছরের বড় ছিলেন। সারাটা জীবন খুব ভালো না কাটলেও, ফ্রিদা লরেন্সের যৌন সহচার্য বেশ উপভোগ করেছেন। লরেন্স যখন সাধারণ লোকদের মধ্যে যৌন শিক্ষা প্রচারে ব্যস্ত থাকতেন, তখন ফ্রিদা ইতালিয়ান চাষি আর অফিসারদের সঙ্গে যৌন সঙ্গমে মিলিত হতেন। লরেন্স কিন্তু এতে কিছু মনে করতেন না। এ বিষয়ে একটা সংঘও তিনি গঠন করেছিলেন। 
সংঘের কাজ ছিল রক্তমাংসের শরীরের ইচ্ছার ক্ষুধাগুলো মেটানো। তার ‘উইম্যান ইন লাভ’ বইয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে। এ ছাড়াও লরেন্স ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ উপন্যাসে বলেছেন, ‘আমি এমন পুরুষ এবং মহিলা দেখতে চাই, যারা সৎ, স্বচ্ছ এবং পরিষ্কারভাবে যৌন চিন্তা করে।’ 
সর্বশেষ লরেন্সের বন্ধু এবং তার আত্মজীবনীকার রিচার্ড আলকিংটনের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি আরেকটি তথ্য। আলকিংটন বলছেন, ‘মেয়েদের সঙ্গে যখন লরেন্সের বিরক্তি ধরে যেতো, তখন সে পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক কামনা করতো। পুরুষের নগ্ন দেহও তাকে মুগ্ধ করতো’।   

 

আরো খবর