শুক্রবার, ২৩ জুন ২০১৭, ৯ আষাঢ় ১৪২৪, ২৮ রমজান, ১৪৩৮ | ০৮:৪৩ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
বুধবার, ০৭ জুন ২০১৭ ০৭:০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

না জানিয়েই কাটা হচ্ছে ব্যাংক হিসাবের শুল্ক

সরকার বছরের পর বছর ধরে অনেকটা লুকিয়েই আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক কেটে রাখছে। ব্যাংক গ্রাহকেরা এসব জেনেও কিছু করতে পারছেন না। মাশুল কাটা নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ থাকছে বছরজুড়েই। বিভিন্ন সময়ে বাজেটে আবগারি শুল্ক বাড়ানো হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র দুবার ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপের ঘোষণা বাজেটে উল্লেখ ছিল। বাজেটের বাইরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আলাদা করেও আবগারি শুল্ক বাড়ায়। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে আমানতকারীদের জানানো হয়নি। এই অবস্থায় সাবেক ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ অনৈতিক ও বেআইনি। এমনকি তাঁরা ব্যাংক আমানতের ওপর সব ধরনের আবগারি শুল্ক তুলে দেওয়ার দাবি জানান। ১৯৯১ সালে ভ্যাট চালুর আগে আবগারি শুল্ক ও বিক্রয় কর ছিল রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস। ১৯৯১ সালে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আইন চালুর পর আবগারি শুল্ক ক্রমান্বয়ে প্রায় সবই বাতিল করা হয়। রেখে দেওয়া হয় ব্যাংক আমানত ও বিমানের টিকিটের ওপর। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরের বাজেটে সাইফুর রহমান ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতের ওপর ১৫০ টাকা আবগারি শুল্ক আরোপ করেন। এরপর থেকে ছয়বার এই শুল্কের পরিমাণ বাড়ানো হলেও কখনো বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে আমানতকারীরা জানতেনই না এই শুল্কের কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, কর পরিশোধ করার পর বৈধ টাকা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রক্ষার পরিবর্তে আবগারি শুল্কের নামে জোর করে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রের এই অধিকার নেই, এটা অবৈধ, সংবিধানেরও পরিপন্থী। এটি বৈধ সম্পত্তি আত্মসাৎ করার মতো ঘটনাই। এটি অবশ্যই বেআইনি। ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, এত দিন বিষয়টি নজরে আসেনি। কারণ আগে হিসাবে টাকা থাকলে কিছু সুদ পাওয়া যেত। এখন সুদের হার কম, এই টাকা কাটা হলে আসল টাকাও কমে যাবে। তাই ব্যাংকের হিসাবের ওপর কোনো ধরনের আবগারি শুল্ক কাটা বৈধ হবে না। ব্যাংক আমানতের ওপর এভাবে আবগারি শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে নতুন অর্থবছরের বাজেট। আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ আয় আরও কমে যাওয়ার শঙ্কার মধ্যে পড়েছেন। নতুন বাজেট ক্ষুদ্র আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আমানতকারীদের একটি বড় অংশ গত তিন দিন আমানত থেকে অর্থ কেটে রাখা নিয়ে ব্যাংকে খোঁজখবর নিচ্ছেন। অনেকে অর্থ তুলে নেওয়ার কথাও বলেছেন। ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ নিয়ে সবাই এখন চিন্তিত। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরে আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক খাতে রাজস্ব আয় হবে মাত্র ৯২৫ কোটি ৭০ লাখ ৮২ হাজার ৭০০ টাকা। এই অর্থ মোট রাজস্ব আয়ের মাত্র দশমিক ৩১ শতাংশ। আর এই খাতের আয়ের মধ্যে ৫৮৪ কোটি টাকাই আসবে স্বল্প আমানতকারীদের কাছ থেকে। অর্থাৎ, ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে নতুন প্রস্তাব কার্যকর না করলে এই খাতে আদায় হবে প্রায় ৭১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, আবগারি শুল্ক হার বৃদ্ধি করে সরকার বাড়তি আয় করবে ৩৫৬ কোটি টাকা। ব্যাংকে ব্যাংকে খোঁজ সহিদ হোসেন, দ্বিতীয় প্রজন্মের সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। বাজেট উপস্থাপনের পর কমপক্ষে ১৫ জন গ্রাহকের ফোন পেয়েছেন ব্যাংক হিসাবের ওপর প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক নিয়ে। সবারই বক্তব্য এক, ঘোষিত আবগারি শুল্ক কাটা হলে তাঁরা টাকা তুলে নেবেন। সুদের হার বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন সবাই। পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করে সহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। জমা টাকা নিয়ে সবাই চিন্তিত। কমে যায় কি না, এই আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। শাখায়ও আসছেন অনেকে। গত তিন দিন রাজধানীর মতিঝিলের সোনালী ব্যাংকের লোকাল শাখা, অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা, ইসলামী ব্যাংকের স্থানীয় শাখা, পূবালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় গিয়ে দেখা গেছে, নিয়মিত গ্রাহকদের পাশাপাশি অনিয়মিত গ্রাহকেরাও এসেছেন। তাঁদের সবাই জানতে এসেছেন, কবে থেকে অতিরিক্ত শুল্ক কাটা হবে, হিসাব থেকে আর কী কী মাশুল কাটা হবে। ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে সুদের হার কমে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৫ শতাংশ। সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ। প্রতিবছর কাটা হবে হিসাব পরিচালনা মাশুল, এটিএম কার্ড ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং মাশুল। কোনো হিসাবে মুনাফা হলে এর ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। এমডিরাও প্রত্যাহার চান আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি শাহ আলম সারওয়ার প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘোষণার পর ছোট গ্রাহকেরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। এটা প্রত্যাহার করে নিলেই ভালো। এর মাধ্যমে যে অর্থ আসবে, তার চেয়ে বেশি সুনাম ক্ষুণ্ন হবে। পূবালী ব্যাংকের এমডি এম এ হালিম চৌধুরীও মনে করেন, সরকার বিষয়টা পুনর্বিবেচনা না করলে জনগণ কোথায় যাবে? ব্যাংক এশিয়ার এমডি আরফান আলী বলেন, ‘কোনো পণ্যকে নিরুৎসাহিত করতে আবগারি শুল্ক দেওয়া হয়। ব্যাংক হিসাবে তো এ ধরনের শুল্ক হয় না। আমরা বিষয়টা প্রত্যাহারের দাবি জানাই।’ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান প্রথম আলোকে বলেন, এ কারণে আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরুৎসাহিত হবেন। এতে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। কার কত আমানত অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো হিসাবে ১ লাখ ১ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে কাটা হবে ৮০০ টাকা। আর ১০ লাখ ১ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জমা বা উত্তোলন হলে কাটা হবে আড়াই হাজার টাকা, ১ কোটি ১ থেকে ৫ কোটি টাকা হিসাবে থাকলে কাটা হবে ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার বেশি হিসাব থেকে ২৫ হাজার টাকা কেটে রাখা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে হিসাব রয়েছে ৮ কোটি ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৯৪৬টি। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ আছে এমন হিসাবের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯৬ লাখ। আর ১ লাখ ১ থেকে ১০ লাখ টাকা আছে এমন হিসাবের সংখ্যা ৭৩ লাখ ১৬ হাজার ৮৬৯ টি। ১০ লাখ ১ থেকে ১ কোটি টাকা আছে এমন হিসাবের সংখ্যা ৯ লাখ ৬২ হাজার, ১ কোটি ১ থেকে ৫ কোটি টাকা হিসাবের সংখ্যা ৫১ হাজার ৭৮১টি এবং ৫ কোটি টাকার বেশি আছে এমন হিসাব ১৪ হাজার ১৬টি।

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর