রোববার, ২৮ মে ২০১৭, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২ রমজান, ১৪৩৮ | ০৬:৪০ অপরাহ্ন (GMT)
ব্রেকিং নিউজ :
X
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
মঙ্গলবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৬ ০৪:২৭:২৭ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

পাঁচ বছরে অর্ধেক কমেছে বীমা খাতের মূলধন

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবুও সময়ের বিবর্তনে দেশের পুঁজিবাজারে বীমা খাতের মূলধন ক্রমেই কমেছে। যদিও ২০১০ সালের ধস এবং ধস পরবর্তী ধারাবাহিক মন্দায় এ খাতের বাজার মূলধন অনেকটাই বেড়েছিল। তবুও ২০১১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে পর্যন্ত এ খাতের বাজার মূলধন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। শতাংশ হিসেবে যা ১০০ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এ খাতের বাজার মূলধনের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫৪৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ২০১০-১১ অর্থবছরের শুরুতে তা বেড়ে ১৪ হাজার ১০ কোটি ৪০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এরপর ২০১১-১২ অর্থবছরের জুলাই মাসে তা ১৫ হাজার ৫৩ কোটি টাকার ওপরে ওঠে আসে। কারণ ওই সময় থেকেই এ খাতের কোম্পানিগুলো বাজারে বিনিয়োগ শুরু করে। কিন্তু তা অব্যাহত না থাকায় পরবর্তীতে প্রায় প্রতিমাসেই এ খাতে বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে তা ২০১১-১২ অর্থবছর শেষে ১০ হাজার ৭১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকায় নেমে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এ খাতে বাজার মূলধনের পরিমাণ ৭ হাজার ১৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। সে হিসেবে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এ খাতের বাজার মূলধন কমেছে ৬ হাজার ৯৯১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। মুলত, সঠিক তদারকির অভাবে দেশের বীমা খাতে অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে। গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা, অবৈধভাবে অর্থ খরচ, চেক জালিয়াতি, ভুয়া এজেন্ট, বিভিন্ন পদে অযোগ্য ব্যক্তি, অতিরিক্ত কমিশন, বাকি ব্যবসাসহ নানা ধরনের দুর্নীতি আর অনিয়ম হরহামেশাই চলছে বীমা খাতে। ব্যাংকিং খাতে কড়া নজরদারির কারণে বীমা খাতকে অনেকেই বেছে নিয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভাষায়ও বীমা খাত ফাঁকিবাজিতে খুবই দক্ষ। এ খাতটি আর্থিক খাতের মধ্যে সব থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলেও মনে করেন তিনি। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, বীমা খাত নিয়ে আগে কোন কাজ হয়নি। আর্থিক খাতের মধ্যে সব চেয়ে দুর্বল ছিল বীমা খাত। এ খাতে ভয়ঙ্কর দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়। জানা গেছে, বর্তমানে বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইন বহির্ভূত কমিশন বাণিজ্য, বাকিতে ব্যবসা, প্রিমিয়াম সংগ্রহের চুক্তিনামার ভুয়া কাগজ তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য লোক নিয়োগ, শীর্ষ ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া কোম্পানির সম্পদ ক্রয়ের সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ করছে পুকুরচুরি। বিশেষ করে জমি ক্রয়ের সময় দ্বিগুণ তিনগুণ মূল্য দেখানো হচ্ছে। একই ঘটনা ঘটছে অন্য সব পণ্য ও সম্পদ ক্রয়ের ক্ষেত্রে। ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঘটছে নানা অনিয়ম। একই ব্যক্তি একাধিক গাড়ি ব্যবহার করছেন। কোম্পানির গাড়ি পারিবারিক কাজে এমনকি রেন্ট এ কার-এ ভাড়া খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। বীমা কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছেন কর্তা ব্যক্তিরা। আর এসব অনিয়মের কারণেই এ খাতের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা। জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে অন্য খাতের কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। গ্রামীণফোন, তিতাস গ্যাসের মতো বিশাল মূলধনের কোম্পানি বাজারে এসেছে। বাজারে ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারের সংখ্যাও এখন অনেক। এছাড়া মূলধন ও শেয়ার সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক খাতের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগের মতো ঝোঁক নেই। এ কারণেই গত কয়েক বছরে বাজার মূলধন ও মোট লেনদেনে বীমা খাতের অংশ কমেছে। বিশেষ করে ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা ঊর্ধ্বমুখী বাজারে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মৌলের শেয়ারের আধিপত্য বেড়ে যাওয়ায় বীমা খাত নিজের অংশ হারিয়েছে। অন্যদিকে ২০১১ সালে টানা মন্দায় ওইসব কোম্পানির তুলনায় বীমা খাতের দরপতন বেশি হওয়ায় বাজার মূলধন ও লেনদেনে আর্থিক খাতের অবস্থানের উন্নতি ব্যহত হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি এ খাতের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে ফিরে আসলে বাজারে লেনদেন আবারো হাজার কোটি টাকার ওপরে ওঠে আসবে। তারা বলেন, পুঁজিবাজারে অন্য কোম্পানিগুলোর তুলনায় ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক খাতের বিনিয়োগ অনেকটা টেকসই। কারণ এ খাতের কোম্পানিগুলোর পোর্টফোলিও ম্যানেজার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোম্পানির ভালো মৌলভিত্তি দেখেই শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। পুঁজিবাজারে নিয়মিত বীমা খাতের বিনিয়োগ থাকলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে অনেকটা আস্থা ফিরে পাবে। আর এই তিন খাতের বিনিয়োগ হ্রাস পেলে বাজারে কিছুটা হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে। জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক হাসান মাহমুদ বলেন, পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই অর্থনীতির জন্য বীমা খাত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমাদের দেশে বীমা খাতে নানান বিশৃঙ্খলা রয়েছে। বীমা কোম্পানির দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ সাংগঠনিক কাঠামো, বীমা পলিসির বিদ্যমান উচ্চ প্রিমিয়াম রেট এবং পেশাগত বীমা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ না থাকা, বীমা কোম্পানির করপোরেট গভর্ন্যান্সের অভাব, কোম্পানিগুলোর আ্যাকচ্যুয়ারি না থাকার খেসারত গুনতে হয়েছে নানাভাবে। বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহের ‘ব্যবসায় সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব' এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেই। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দন্দের নেতিবাচক প্রভাবে অনেকটাই থমকে গেছে এ খাতের প্রত্যাশিত অগ্রযাত্রা। তবে বীমা কোম্পানিগুলো নিয়ম মেনে ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মতো ব্যবসা করলে বীমা খাতে একটি সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসবে। যা বীমা খাতের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর