রোববার, ২২ অক্টোবর ২০১৭, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর, ১৪৩৯ | ০৭:০৩ অপরাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ ০৭:৩০:৪১ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

নতুন সিইসি নিয়েও সংশয়

হারুন-আর-রশিদ

 

 

 

 

 

 

নতুন সিইসি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। দেশের সুশীলসমাজ ও বিশেষজ্ঞরাও মুখ খুলছেন। তারা বলেছেন, নতুন সিইসি আওয়ামী ঘরানার ঘনিষ্ঠ লোক। কথাটি মিলে যায় নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন সিইসির সাক্ষাৎকারে, যা প্রথম আলোতে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়। সিইসি নূরুল হুদা বলেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির সাথে আমার সংশ্লিষ্টতা ছিল, আমি ছিলাম ফজলুল হক হলের ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। ১৯৭২ সালে পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হই।’ আমরা সবাই জানি, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সবাইকে অটোপ্রমোশনের একটি সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে সিইসির নামও ছিল। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৭৩ সালে তার চাকরি জীবন শুরু হয়। তার বক্তব্য ছিল- আমি এখন অতীত ভুলে যেতে চাই। আজ থেকে আমি নতুন মানুষ। বর্তমান দায়িত্ব নিয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে চাই। কিন্তু কথা থেকে যায়- যা নতুন সিইসি স্বীকার করেছেন। বলেছেন, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার বিনা কারণে আমাকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছিল। তখন মাত্র ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হয়। বিএনপি সূত্র বলেছে, জনতার মঞ্চের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে তার বিরুদ্ধে ওই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। নতুন সিইসি তা অস্বীকার করলেও সাবেক সচিব মোফাজ্জল করিম দাবি করেছেন, জনতার মঞ্চের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণেই বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছিল। নূরুল হুদা এর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। সেই আইনি যুদ্ধে তিনি বিজয়ী হন, এ কথাও তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জনতার মঞ্চ যখন ঢাকায় চলছিল, তখন কুমিল্লার ডিসি ছিলাম। তখন কুমিল্লায় ডিসি অফিস থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবি নামানোর ঘটনা ঘটেছিল। কথাটি ঠিক। কিন্তু কাজটি কে বা কারা করেছে তা আমি জানি না। নূরুল হুদা বলেছেন, ২০০৮-২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদালতের রায়ে চাকরি ফিরে পেয়েছি। আদালতের রায় ছিল ভূতাপেক্ষভাবে সব সুযোগ সুবিধা, পদমর্যাদাসহ আমাকে চাকরি ফিরিয়ে দিতে হবে।’ বিএনপির শাসনামলে, ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত চাকরিতে ফেরেননি। এ কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিনি চাকরিতে আবার যোগদান করেন। উল্লেখ্য, তিনি স্বাধীনতার ২৮ দিন আগে ১৮ নভেম্বর ১৯৭১ সালে পটুয়াখালীর গলাচিপার পানপট্টিতে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হয় ১৬ ডিসেম্বর। দেশ স্বাধীন হওয়ার সব কিছুই যখন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, অর্থাৎ নভেম্বর মাসের শেষ দিকে তিনি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। যা হোক, নূরুল হুদার সাক্ষাৎকারের আলোকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায়- তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। প্রথম কারণ, তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। দ্বিতীয় কারণ, জনতার মঞ্চ (১৯৯৫-১৯৯৬) যখন জাতীয় প্রেস ক্লাব সম্মুখস্থ সড়কে স্থাপন করে মখা আলমগীরের নেতৃত্বে চাকরিরত অবস্থায় সরকারি আমলাদের বিদ্রোহ ঘটে, কুমিল্লার ডিসি নূরুল হুদার অফিস থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছবি নামিয়ে ফেলা হয়। এটাও তিনি স্বীকার করেছেন। তৃতীয় কারণ তার চাকরিচ্যুতি ঘটে বিএনপির দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর। চতুর্থ কারণ নূরুল হুদা চাকরি ফিরে পান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর। এরপর নানা পদে তিনি চাকরি করেছেন। তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এসব কারণে বলা যায়, তিনি কখনোই আওয়ামী মতাদর্শের বাইরের ব্যক্তি ছিলেন না। উপরন্তু বিএনপির প্রতি তার রাগ-বিরাগ ছিল, সেটাও তার সাক্ষাৎকারে প্রমাণ মেলে। শেষে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি অতীতকে ভুলে যেতে চাই। আজ আমি নতুন দায়িত্ব পেয়েছি। সেই দায়িত্ব নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে করতে চাই।’ সিইসিকে হতে হবে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি। কিন্তু দেখা গেছে, তিনি ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সব সুযোগ-সুবিধা আওয়ামী লীগ সরকারের দুই টার্মে ক্ষমতায় আসার পর পেয়েছিলেন। 
এখন আমাদের প্রশ্ন, মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে যিনি জাতির অভিভাবকের আসনে বসে আছেন তিনি কি একজন সত্যিকার নিরপেক্ষ ব্যক্তি খুঁজে পাননি, সার্চ কমিটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নামগুলোর মধ্যে? ভবিষ্যতে নতুন সিইসি নূরুল হুদা যে রকীব কমিশনের মতো নির্বাচনী প্রহসনের পথ করে দেবেন না- তার কোনো নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবেন। আমরা চাই বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক একটি সন্ত্রাসমুক্ত নির্বাচন; যে নির্বাচন দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক মহল তখন বলবে, সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছে নির্বাচন কমিশন। সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০১৮-১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত। আল্লাহ না করুন, যদি রকীব মার্কা নির্বাচন দিয়ে মানুষ খুন করে বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার কোনো মহড়া হয়, তাহলে এর দায়ভার আওয়ামী সরকার এড়াতে পারবে না। মরহুম প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সময়ে বাছাই কমিটির নিয়োগপ্রাপ্ত রকীবউদ্দিন কমিশন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে একটি কালো অধ্যায় বিদায়ী কমিশন জাতিকে উপহার দিয়েছে। এ ছাড়াও কয়েকজনের লাশ পড়েছে। স্বজনহারা মানুষের বুকফাটা ক্রন্দন এখনো বাংলার আকাশ-বাতাসে মিশে আছে। আওয়ামী লীগ কৌশলী ভূমিকায় থেকে জোটের শরিক গণতান্ত্রিক পার্টি ও তরিকত ফেডারেশনের মাধ্যমে দেয়া পাঁচজনের নামই বাছাই করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এখন ২০ দলীয় জোটের লক্ষ্য, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার। অনেকেই বলছেন, এ ক্ষেত্রেও ২০ দল অকৃতকার্য হবে। আওয়ামী লীগের চাতুর্যপূর্ণ রাজনীতির সাথে বিএনপি কুলিয়ে উঠতে পারেনি। পারেনি ১৯৯৬ সালে, পারেনি ২০০৬ সালে, পারেনি ২০০৮-২০০৯ সালে এবং পারেনি ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে। হেরে গেল চলতি মাসে সিইসি নিয়োগ প্রদানকালে। যুদ্ধ করতে হয় কৌশলী হয়ে, ডিফেন্সিভ বা অফেন্সিভ সব ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। একই কথা রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রমাণ করে দিয়েছেন। ডিজিটাল কারচুপি করে ইলেকটোরাল নির্বাচনে হিলারিকে পরাজিত করেছেন গোটা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে।
সুজন-এর সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছিলেন, নতুন সিইসি প্রসঙ্গে, ‘আমার কাজ আমি করমু তোদের শুধু জিগাইয়া লমু।’ সেই আশঙ্কা সত্য হলো। প্রফেসর আসিফ নজরুল টিভি চ্যানেলে বলেছেন, একজন আওয়ামী লীগারকে সিইসি পদে আসীন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের পছন্দেরই প্রতিফলন ঘটেছে। অনেকের মুখ থেকে শুনেছি, বিচারপতি কে এম হাসানকে আওয়ামী লীগ প্রতিহত করতে পেরেছে কোনো এক সময় বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অজুহাতে। আওয়ামী লীগ (২০০৬-২০০৭) যে কাজটি প্রতিহত করার যোগ্যতা দেখাতে পেরেছিল, সেটি পারেনি বিএনপি-বিরোধী দলে অবস্থান করে। ৫০ বছর পূর্তি ২০২১ সাল। এটা আওয়ামী লীগ জাঁকজমকপূর্ণভাবে করবে এ কথা ২০০৮-২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বলছে। সেই ছক ধরেই তারা এগোচ্ছে। অনেক ইস্যু আওয়ামী লীগ বিএনপির হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু একটি ইস্যুও কাজে লাগাতে পারেনি। জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও এটা করতে পারেনি রাজনীতির কলা কৌশল না জানার কারণে।
ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন এবং এটা তার বিখ্যাত উক্তিÑ ‘তুমি সমস্যার অধিনায়ক হও। সমস্যাকে পরাজিত করো এবং সফল হও।’ বিএনপির উচিত এই বাক্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। সবাই বলছে এবং পত্রপত্রিকা ও বিদেশী মিডিয়াও বলছে, বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের গণতন্ত্রের অপর নাম হলো দলীয় শাসনব্যবস্থা। অথচ কাগজে কলমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম বহুদলীয় গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র পরমতসহিষ্ণুতা। আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান, বলা হয়েছে সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে। ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা। 
সংবিধানে বলা আছে, সংসদকে কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারি দল ও বৃহত্তম বিরোধী দলের। নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং সুশাসন এসব কি দেশে আছে। সব কিছুই আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। জবাবদিহিতামূলক শাসনপদ্ধতিও দেশে নেই। জবাবদিহিতার সংসদও দেশে বিগত ৪৬ বছরে গড়ে ওঠেনি। 
তার পরও এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কিভাবে বলে, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ, সুশাসনের দেশ। নিজের কাছেই লজ্জা হয়, যখন শুনি এসব অসার বচন। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্ট (ঊওঠ)-এর নবম বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪। 
হাইব্রিড তথা শঙ্কর ধারার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ আজ। এসব নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো- আজ এত প্রতীক্ষার পরও জাতি পেল প্রশ্নবিদ্ধ একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। আমরাও নিশ্চিত ছিলাম রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর অপছন্দনীয় কোনো ব্যক্তিকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন না। বাস্তবে সেটাই হয়েছে। 
লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক ও কলামিস্ট
email : harunrashidas@gmail.com

আরো খবর