মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২ রবিউল আওয়াল, ১৪৩৯ | ০২:২৭ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি


শুক্রবার, ২০ অক্টোবর ২০১৭ ০৬:৪০:৪৮ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

দৃষ্টান্ত স্থাপনে ইসলাম নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে চাই, ধর্মান্তরিত রুশ নারী

মস্কো: রাশিয়ায় কমিউনিজমের অধীনে ঈশ্বরের ধারণা গত সাত দশক ধরে অনুমোদন করা হয়নি। তারপরেও সেখানে দ্রুত ধর্মীয় নবজাগরণ প্রত্যক্ষ হয়ে আসছে। দেশটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক ইসলামের মাঝে মনের শান্তি খুঁজে পেয়েছেন। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ রাশিয়ান অর্থডক্স খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী। রাশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মূলত অভিবাসীদের দ্বারা ইসলামের প্রসার ঘটেছে। তা সত্ত্বেও দেশটিতে মুসলমানদের বিদেশি বা বহিরাগত হিসেবে গণ্য করা হয় না। রাশিয়ার অনেক আদিবাসীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলাম ধর্মের প্রতি তাদের গভীর আনুগত্য প্রকাশ করে আসছে এবং খ্রিস্টানদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করছে। যাইহোক, সোভিয়েত আমলে কোনো ধর্মকে বরদাশত করা হতো না। কিন্তু কমিউনিজমের পতনের পর অর্থডক্স খ্রিস্টান এবং ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটেছে। বর্তমানে রাশিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। সর্বশেষ আদমশুমারিতে দেশটির নাগরিকদের তাদের ধর্ম সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন জানতে চাওয়া হয়নি। সুতরাং রাশিয়ান মুসলমানদের সংখ্যা গণনা করা হয় সাধারণত যারা ঐতিহ্যগতভাবে মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর তাদের সব সদস্যদের যোগ করে। এসব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে তাতার, বাশখির এবং চেচেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ১৬ থেকে ২০ মিলিয়ন ‘জাতিগত মুসলিম’ রয়েছে যা রাশিয়ার জনসংখ্যার ১২-১৫ শতাংশ। উপরন্তু, সেখানে কিছু ‘নতুন মুসলমান’ যোগ হয়েছে যারা মুসলিম নন কিংবা অন্যান্য ধর্মের প্রতি আনুগত্য ছিল এবং তারপরে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। ককেশাস স্টাডিজ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কেন্দ্রের সিনিয়র সহকর্মী নিকোলাই সিলাভে বলেছেন, ‘এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে প্রচারণা বেশ বিরল। কিন্তু কোনো মুসলমান গোঁড়া খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হলে রাশিয়া জুড়ে ব্যাপক প্রচার পেত।’ সম্প্রতি ‘রাশিয়া বিয়ন্ড দ্য হেডলাইন’ নামে দেশটির একটি ইংরেজি সংবাদ মাধ্যম ইসলামে ধর্মান্তরিত তিন নারীর সাক্ষাৎকার নেয়। আরটিএনএনের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। ভ্যালেরিয়া (২২)। পাঁচ বছর আগে ২০১১ সালে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘আমি একটি খ্রিস্টান পরিবারে বড় হয়েছি এবং মুসলিম হওয়ার সিদ্ধান্তে আমার পরিবার মর্মাহত হয়। প্রথমে তারা এ সম্পর্কে খারাপ কিছু চিন্তা করেছিল। তারা বিশ্বাস করতেন আমি অদূর ভবিষ্যতে যানবাহন বোমার আঘাতে উড়িয়ে দেব।’ ‘যাইহোক, আমি পরিবারের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ আমার পছন্দকে সম্মান জানানোর জন্য। বিশেষ করে মায়ের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যিনি অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ের মধ্যে আমার সিদ্ধান্তকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং এমনকি আমার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছ থেকে মা আমাকে সুরক্ষিত রেখেছেন,’ ভ্যালেরিয়া বলেন। তিনি বলেন, ‘ধর্মান্তর হওয়ার পর আমি ইসলাম নিয়ে অধ্যয়ন করতে শুরু করি এবং নামায পড়তে শুরু করি। দুই মাস পরে আমি হিজাব পরা শুরু করি। তারপর আমি আমার ভবিষ্যত স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি একজন জাতিগত তাতার কিন্তু তার পরিবার ইসলাম মেনে চলে না। পরিশেষে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই এবং আমরা আমাদের নিজেদের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করি।’ ওলেয়ানা (৩০)। সাত বছর আগে ২০০৯ সালে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। ওলেআনা বলেন, ‘ইসলামের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আমার আগ্রহ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আমি ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক ধারণা পাই এবং আরবি শিখি। সেখানে আমার অনেক মুসলমান বন্ধু ছিল। বর্তমানে সমাজে মুসলিমদের নিয়ে স্বাভাবিকভাবে যা বিবেচনা করা হয়ে থাকে তাদের সবার আচরণ ছিল তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ কারণেই আমি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমার বাবা-মা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা আমার পছন্দ বুঝতে পেরেছিল যেমনটি তারা আশা করেছিল।’ ‘আমি স্কার্ফ পরি না তবে নামাজের সময় নিজেকে পরিপূর্ণভাবে ঢেকে নেই। প্রথমে রোজা রাখাটাও আমার জন্য কঠিন ছিল কিন্তু আমি গত তিন বছরে এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এছাড়াও ইসলাম নিয়ে গৎবাঁধা কিছু বিষয় নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, ইসলাম একটি নিষ্ঠুর ধর্ম। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে এমন মতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষন করি। আমি মনে করি সকল ঐশ্বরিক শিক্ষা সুমহান কল্যান আর ভালবাসা দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে,’ বলেন ওলেয়ানা। তিনি বলেন, ‘ইসলামে কথিত গৎবাঁধা অনেক বিষয় আছে। উদাহরণস্বরূপ, মুসলমান কর্তৃক কাফের হত্যা, প্রাণি জবাই, স্ত্রীদের মারধর ও অবিশ্বাসীদের গ্রহণ না করা ইত্যাদি। এই মনোভাবের কারণ হচ্ছে অজ্ঞতা। আপনি কিছু বুঝতে না পারলে কিংবা কোনো বিষয়ে ভয় পেলে আপনার উচিত হবে সেই ভয় বাস্তবসম্মত কিনা তা খুঁজে বের করা। আমি মনে করি ধর্মের সঠিক অনুশীলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিই পারে তাদের এই ভয় দূর করতে।’ জয়নাব ওরফে এলেনা (৫৫)। ২০০৬ সালে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। জয়নাব বলেন, ‘এটা ছিল ৯০ এর দশকের শেষের দিক। আমার স্বামীকে নিয়ে পর্যটক হিসেবে আমরা মিসর সফর করি। কোনো মুসলিম দেশে এটা ছিল আমার প্রথম সফর। সেখানে আমি সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন মানসিকতার মানুষদের দেখেছি। এই সংস্কৃতির মধ্যে নিমগ্ন থাকার ফলে আমি আরব বিশ্বের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি এবং আমি কোরান নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করি।’ তিনি বলেন, ‘৪০ বছর বয়সে আমি আমার স্বামীকে বললাম যে, আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চাই। আমার স্বামী এবং সন্তানরা আমার মনোভাব বুঝতে পেরে আমার সিদ্ধান্তে শান্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কিন্তু আমার মা বিষয়টি অতটা সহজভাবে মেনে নেয়নি। মূল সমস্যা ছিল মাথায় হিজাব পরা নিয়ে। যদিও পরিস্থিতি এখন মীমাংসা হয়ে গেছে। এখন আমার মা আমার জন্য হালাল খাদ্য ক্রয় করেন। চার বছরের মধ্যে আমার জ্যেষ্ঠ কন্যাও ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়।’ ‘ইসলাম গ্রহণ করার অল্পদিন পরেই আমি বুঝতে পারলাম আমার মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং তখন আমি আমার এলেনা নাম পরিবর্তন করে একটি মুসলিম নাম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেই। আমার পরিবর্তিত নাম হয় জয়নাব,’ বলেন তিনি। জয়নাব বলেন, ‘আমি ইংরেজি এবং জার্মান কারিগরি অনুবাদক হিসেবে কাজ করি। যখন আমি হিজাব পরিধান করি আমার সহকর্মীরা আমার সঙ্গে দুর্বল আচরণ করা শুরু করেন। একটি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে এমন আচরণে আমি অত্যন্ত কষ্ট পাই। ওই সময় আমি খুবই মর্মাহত ছিলাম কিন্তু দুই মাস পরে আমি প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য একটি ফার্ম থেকে একটি চাকরির প্রস্তাব পাই। ওই একই কাজে আমাকে আগের চেয়ে দ্বিগুন বেতন অফার করে তারা। আমি তাদের বললাম যে, কর্মক্ষেত্রে আমি মাথায় হিজাব পরতে পারব কিনা। উত্তরে তারা জানায়, এটা কোনো সমস্যা না। তাদের প্রয়োজন দক্ষতা আর কাজ।’ এই নারী আরো বলেন, ‘উদাহরণ স্থাপনের মাধ্যমে আমি ইসলাম নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে চাই। জনগণ ইসলাম সম্পর্কে দীর্ঘ বক্তৃতা শুনতে চায় না। তারা কেবল আপনার কাজকেই বড় করে দেখে। আমি বলব, মুসলিমরা প্রকৃত অর্থেই অনেক ভালো।’






আরো খবর