সোমবার, ২১ আগস্ট ২০১৭, ৬ ভাদ্র ১৪২৪, ২৮ জিলকদ, ১৪৩৮ | ১০:০৬ পূর্বাহ্ন (GMT)
ব্রেকিং নিউজ :
X
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ ১২:২০:০৮ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

রডের বদলে বাঁশ দিয়েও শাস্তি নামমাত্র

 

সারা দেশে সরকারি ভবন তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনা একের পর এক ফাঁস হতে থাকায় পূর্তকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভবন ও স্থাপনাগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। স্বয়ং রাষ্ট্রপতিও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কটাক্ষমূলক মন্তব্য করেছেন। তবে এসব কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি।

গত এক বছরে এ রকম অন্তত চারটি ঘটনা উন্মোচিত হলেও শুধু একটির প্রকল্প পরিচালকসহ দুই কর্মকর্তাকে ‘শাস্তিমূলক বদলি’ করা হয়। আরেকটি ঘটনায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ছাড়া দুটি ঘটনায় দুদকের করা মামলায় দুজন ঠিকাদার জামিনে রয়েছেন।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, বদলিকে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ধরা যায় না। ছোটখাটো অপরাধের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দুর্গম কোনো স্থানে বদলির বিষয়টি প্রথা হিসেবে চালু আছে। কিন্তু বিধি অনুসারে এটা শাস্তি হিসেবে গণ্য নয়। আলী ইমাম মজুমদার বলেন, এটা একটা গুরুতর অপরাধ। এসব ঘটনা প্রচুর মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। তাই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে এর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এই সময়ের মধ্যেই রেলের স্লিপার রক্ষায় বাঁশ ও কাঠের গুঁড়ি ব্যবহারের আরও দুটি ঘটনা উন্মোচিত হলেও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে এর পক্ষে সাফাই গেয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভবন নির্মাণ কিংবা রেল স্লিপার রক্ষায় বাঁশ কখনোই লোহার বিকল্প হতে পারে না। কেবল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত লাভের জন্য সাধারণ মানুষকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি তাঁরা দেখছেন নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে। এ অবস্থায় বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাঁশের সমস্যা হলো, এটা পানি শোষণ করে। যে কারণে এটার আয়তন বাড়ে। এ জন্য কংক্রিট ভেঙে যায়।’ জামিলুর রেজা চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমি এটাকে চুরি করা বলব। মুনাফা বেশি করার জন্য বাঁশ দিয়ে দিয়েছে। এটা বাংলাদেশে বহু জায়গায় হয়ে আসছে। যাঁরা এটা তদারকি করেন, তাঁদেরও যোগসাজশ থাকতে পারে। সবাই মিলে টাকাটা হয়তো ভাগাভাগি করে নেয়। এটা দ্রুত বন্ধ করতে হবে।’


চুয়াডাঙ্গা দিয়ে শুরু

ইস্পাতের রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের প্রথম ঘটনাটি উন্মোচিত হয় চুয়াডাঙ্গা জেলায়। গত বছরের এপ্রিল মাসে জেলার দর্শনায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্মাণাধীন একটি ভবনে রডের পরিবর্তে বাঁশের চটা ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানাজানি হলে কাজ বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। পরে ওই প্রকল্প পরিচালক সাদেক ইবনে শামছসহ আরও দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। সাদেক ইবনে শামছকে প্রথমে খাগড়াছড়িতে বদলি করা হলেও সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা সেখানে তাঁর যোগদানের বিরোধিতা করলে তাঁকে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ তদারকি ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা মেরিনা জেবুন্নাহার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জয় ইন্টারন্যাশনালের মালিক মণি সিং, তদারকির দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সাত্তার, প্রকল্পের ক্রয় বিশেষজ্ঞ আইয়ুব হোসেন ও অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেনকে আসামি করে দামুড়হুদা থানায় একটি ফৌজদারি মামলা করেন। এ ছাড়া জয় ইন্টারন্যাশনালকে কালো তালিকাভুক্ত করে অধিদপ্তর। পরে চুয়াডাঙ্গার আমলি আদালত মামলার তদন্তভার দুদকে ন্যস্ত করেন। এ ঘটনায় মণি সিংকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি এখন জামিনে আছেন।

একই মাসে গাইবান্ধায় মেঘডুমুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শৌচাগার (ওয়াশ ব্লক) নির্মাণকাজেও ইস্পাতের রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের খবর আসে গণমাধ্যমে। এ ঘটনায় জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আল আমিনকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। সাময়িক বরখাস্ত করা হয় উপসহকারী প্রকৌশলী আরিফ বিল্লাহকে। পরে দুদকের করা মামলায় তিনিসহ ওই কাজের ঠিকাদার আবদুল খালেক সাময়িক কারাভোগের পর বর্তমানে জামিনে আছেন।

গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের আরেকটি ঘটনা প্রকাশ পায়। এদিন নতুন ভবনের তৃতীয় তলার লিফটের সামনের অংশের টাইলস খুলে বাঁশ বেরিয়ে আসে। তবে এ ঘটনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঘটনা প্রকাশের দেড় মাস পর ১৯ ডিসেম্বর দুদকের রাজশাহীর উপপরিচালক শেখ ফাইয়াজ আলমের নেতৃত্বে প্রাথমিক তদন্তকাজ সম্পন্ন হয়। এর আগে ১৮ নভেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হারুন-অর-রশীদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি তদন্তে আসে। এখনো তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়নি।

এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে পাবনার সুজানগর উপজেলার দুলাই ইউনিয়নের বিন্যাডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের দুটি কক্ষের দরজার ওপরের ঢালাই ভেঙে বাঁশের লাঠি বেরিয়ে আসে। এ ঘটনার পর বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় সেখানে ক্লাস না করানোর জন্য লিখিত নির্দেশ দেয় উপজেলা শিক্ষা বিভাগ। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কর্তৃপক্ষ ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে দাবি করে। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা এখন বিদ্যালয়ের বাইরে খোলা মাঠে ক্লাস নিচ্ছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম বলেন, ‘এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যালয় পরিদর্শন করে মৌখিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছেন। এ বিষয়ে লিখিত চাওয়া হলেও তিনি তা দেননি।’

রাষ্ট্রপতির কটাক্ষ
গত বছরের ৭ মে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ভবন তৈরিতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারে অনিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রকৌশলীদের নির্মাণকাজের ‘কোড অব এথিক্স’ মেনে চলার আহ্বান জানান। এ ধরনের কয়েকটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি উপস্থিত প্রকৌশলীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এতে একদিকে যেমন জনগণের টাকার অপচয় হচ্ছে, তেমনি জনভোগান্তিও বাড়ছে। এ ছাড়া কিছু অসাধু লোকের জন্য আপনাদের সুনামও হানি হচ্ছে। দেশে-বিদেশে আপনাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’

এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, ‘তবে এখানে বলতে চাই, আপনারা যদি বৈজ্ঞানিক কোনো প্রযুক্তি বের করতে পারেন, যাতে বাঁশ লোহার চেয়ে শক্তিশালী (হবে), তাহলে কোনো কথাই হবে না।’

রেলের স্লিপার রক্ষায় বাঁশ

রেলসেতুতে স্লিপার রক্ষায় বাঁশ ব্যবহারের প্রথম ঘটনাটি নজরে আসে গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষে। ৩১ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, সিলেট-আখাউড়া রেলপথের মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ২০৬ নম্বর মনু রেলসেতুর শতাধিক নষ্ট স্লিপার স্থানচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে ফালি করা বাঁশ বসিয়ে পেরেক ঠুকে রাখা হয়। যে সেতুটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন বা কেপিআই) হিসেবে চিহ্নিত এবং যার ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করে। খবর প্রকাশের পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মনু রেলসেতু থেকে বাঁশের ফালি অপসারণ করলেও এ ব্যাপারে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সর্বশেষ ১৩ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের উলিপুর পাঁচপীর স্টেশনের কাছে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ অফিস-সংলগ্ন মুক্তারাম ত্রিমোহনী এলাকায় ও টগরাইহাট স্টেশনের কাছে জোতগোবর্ধন এলাকার প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ রেলসেতুর ওপর কাঠের স্লিপার পোক্ত করতে আড়াআড়ি বাঁশের ফালির ব্যবহার দেখা যায়। এ ছাড়া কোথাও কোথাও স্লিপার ঠিক রাখতে কাঠের গুঁড়ি ও সাইকেলের টায়ার ব্যবহারও চোখে পড়ে।

এ নিয়ে দুর্ঘটনার শঙ্কা প্রকাশ করা হলেও তা উড়িয়ে দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ২৩ জানুয়ারি গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়, এতে দুর্ঘটনা ঘটার কোনো অবকাশ নেই। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রেলসেতুর ওপর স্থাপিত কাঠের স্লিপার যাতে ‘আউট অব স্কয়ার’ না হয় এবং একত্রে জমা হতে না পারে, এ জন্য কোনো কোনো রেলসেতুতে অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে স্থানীয়ভাবে বাঁশের ফালি বা চেরাই কাঠ ইত্যাদি ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, এটা একটা সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে, যাতে কাঠের পুরোনো স্লিপারগুলো কম নড়াচড়া করে। কিন্তু কোনোভাবেই এটা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। বরং এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

দুদককে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ

ভবন নির্মাণে বাঁশের ব্যবহারসহ নির্মাণকাজে অনিয়ম-দুর্নীতি রুখতে দুদককে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘যাঁরা দুর্নীতি করেন, তাঁদের যখন বিচারের আওতায় আনা হয় না, বরং অনেক সময় সুরক্ষা দেওয়া হয়, তখন বিভিন্ন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এটার বিস্তার ঘটে। এখন তা নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। এটা যেমন দুঃখজনক, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত শঙ্কার।’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘যে প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যায়, তাহলে এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এ ব্যাপারে অভিযোগের অপেক্ষা না করে দুদক একটি বিশেষ বিভাগ তৈরি করতে পারে, যে বিভাগ সরকারি বিভিন্ন নির্মাণকাজ নজরদারিতে রাখবে।’

দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়ম অনুসন্ধানের জন্য এর মধ্যেই কিছু প্রাতিষ্ঠানিক দল গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরও আছে।

এ ছাড়া রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা ও গাইবান্ধার ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে বলে জানান দুদক সচিব।

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর