সোমবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ৮ কার্তিক ১৪২৪, ২ সফর, ১৪৩৯ | ০১:৩১ অপরাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
বৃহস্পতিবার, ১২ অক্টোবর ২০১৭ ০৮:৪৭:৩৫ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

স্কুল-বিয়ে দুয়েতেই শতভাগ!

যশোরে শতভাগ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী। স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃব্যবস্থা বা স্যানিটেশনের হার ৯৫ শতাংশের বেশি। অথচ সদর উপজেলার একটি গ্রামে বাল্যবিবাহের হার প্রায় শতভাগ। জেলা সদর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে এই গ্রামের নাম ফরিদপুর এবং ইউনিয়ন দেয়াড়া। গত মঙ্গলবার ৯৯০টি পরিবারের ওই গ্রামটি ঘুরে জানা গেছে, এক বছরে সেখানে অন্তত ২০টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেনি এমন মেয়ের সংখ্যা ৫। অন্যদের বিয়ে হয়েছে সপ্তম, অষ্টম শ্রেণিতে থাকতে। গ্রামের লোকজন বলছেন, প্রাপ্তবয়স্ক কোনো মেয়ের বিয়ে হতে তাঁরা দেখেননি। তবে এ বিষয়ে কোনো সমীক্ষা বা জরিপ নেই। ফরিদপুর শতভাগ বাল্যবিবাহের গ্রাম কি না—জানতে চাইলে দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান বলেন, ‘এই পর্যবেক্ষণ উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পরে বা আগে এই গ্রামে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারিনি। প্রায় সব মেয়ের বিয়ে হচ্ছে গোপনে।’ চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান জানান, সম্প্রতি পুলিশ দিয়ে গ্রামটিতে দুটি বাল্যবিবাহ ঠেকানো হয়েছে। অবশ্য কিছুদিন পর বাবা-মা ওই মেয়েদের অন্য এলাকায় নিয়ে বিয়ে দেন বলে তিনি শুনেছেন। এত বাল্যবিবাহের কারণ সম্পর্কে চেয়ারম্যান বলেন, অভিভাবকেরা অসচেতন। দারিদ্র্যও একটি বড় সমস্যা। অন্যদিকে এখন ছেলেমেয়েদের হাতে হাতে স্মার্টফোন। এসব কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা প্রেমে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে মানসম্মানের ভয়ে অনেক বাবা-মা মেয়েকে আগেভাগে বিয়ে দিচ্ছেন।’ এ চিত্র সাম্প্রতিক, না অনেক দিনের—প্রশ্ন করা হলে ওই ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য আলেয়া বেগম বলেন, ‘ফরিদপুর গ্রামে ১৮ বছর পূর্ণ করে কোনো মেয়ের বিয়ে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আমার নিজেরও ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে।’ তিনি জানান, বাল্যবিবাহ বন্ধ করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন এফএমবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিরিন সুলতানা। শিরিন সুলতানা বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাবা-মায়েদের বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু তাঁরা শুনছেন না। চতুর্থ শ্রেণির মাহফুজা খাতুন স্কুলে গিয়ে কান্নাকাটি করে তাকে বিয়ে দেবে বলে জানালে আরেকজন শিক্ষককে নিয়ে গিয়ে অভিভাবকদের পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছি। কিন্তু কত দিন এ বিয়ে আটকে রাখতে পারব, জানি না। মেয়েটির বাবা-মা নেই। দাদির কাছে থাকে। দাদিও পরের বাড়িতে কাজ করেন।’ মাহফুজার সহপাঠী ছিল পাশের বাড়ির আদুরি খাতুন। আট মাস আগে তাকে বিয়ে দিয়েছেন বাবা-মা। আদুরির বিয়ের দিন বাড়িতে পুলিশ গিয়ে বিয়ে বন্ধ করে দেয়। পরে তাকে গোপনে বিয়ে দেওয়া হয়। আদুরির মা শাহিদা বেগম বলেন, ‘ঘরে চারটি মেয়ে, একটি ছেলে। মেয়েদের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। একটি মেয়ের বিয়ে হলেই বাবা-মায়ের স্বস্তি। আমরা গরিব মানুষ। সবাইকে খাওয়ানো-পরানো কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য বিয়ে দিলাম।’ পশ্চিমপাড়ার তারা খাতুন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। কয়েক দিন আগে তাকে পাশের চৌগাছা উপজেলায় আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। তারা খাতুনের বাবা ইমদাদুল হক বলেন, ‘ছেলে কোম্পানির চাকরি করে। এমন ছেলে আর পাব কি না, তাই বিয়ে দেওয়ার কথা মাথায় আসে।’ তারার সহপাঠী রূপা খাতুনের বিয়ে হয়েছে কয়েক মাস আগে। বিয়ের পরদিন রূপা জানতে পারে, তার বর প্রতিবন্ধী। এ জন্য বিয়ের এক মাস পর তালাক দিয়ে বাবার বাড়ি ফিরে এসেছে। এখন সে মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। ফরিদপুর গ্রামের মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় সব ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে আমদাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক এ জেড এম পারভেজ মাসুদ বলেন, সম্প্রতি স্কুলে ৬৮৫ জন মাকে নিয়ে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে ছেলেমেয়েরা কথা শুনছে না বলে মায়েরা জানান। স্মার্টফোন না দিলে তারা হইচই করে। আসলে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের প্রকোপ থেকে উত্তরণ খুব কঠিন। জাতীয় তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, যশোরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ। সেখান থেকে ঝরে পড়ে ৮ দশমিক ১৫ ভাগ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সাক্ষরতার হার ৫৬ দশমিক ৫২ ভাগ। স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থার হার ৯৫ দশমিক ১৯ ভাগ। এমন একটি জেলায় কী করে ফরিদপুরের মতো গ্রাম থাকতে পারে? এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘এমন গ্রামের কথা এই প্রথম শুনলাম। এমনটি হয়ে থাকলে এর কারণ উদ্‌ঘাটন করে সেখানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।’

আরো খবর