বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৬ আশ্বিন ১৪২৪, ২৯ জিলহাজ, ১৪৩৮ | ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
শনিবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১১:০৪:৩১ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

পিটিয়ে, গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করছে রোহিঙ্গাদের

এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা বললেন রাখাইন রাজ্য থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলা-নির্যাতনের মুখে জীবন নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম নারী হামিদা বেগম। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞে’র শিকার হয়ে হাজার হাজার নর-নারীর মধ্যে হামিদাও একটি মুখ। সহায়-সম্বলহীন এই নারী আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের একটি কক্ষে। এখানে তিনি অনিবন্ধিত, শরণার্থীর মর্যাদাও নেই তাঁর। ক্যাম্পেই মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিনিধির সঙ্গে হামিদা বেগমের কথা হয়। তিনি বলছিলেন, ‘মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী অনেক রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে। তাঁরা অনেক রোহিঙ্গা নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। আমরা এখন অসহায়।’ গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ২৪টি পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। জাতিসংঘের গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারে সহিংসতা শুরুর পর গত এক সপ্তাহে ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৭০ জন ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী’, ১৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, দুজন সরকারি কর্মকর্তা এবং ১৪ জন সাধারণ নাগরিক। গত এক সপ্তাহে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাদেরই একজন হামিদা বেগম সব হারিয়ে নিজের জীবনটুকু নিয়েই শুধু বাংলাদেশে এসে পৌঁছাতে পেরেছেন। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও তাদের দোসররা হামিদা বেগমের পরিবারকে নির্যাতন করে এবং পরে মুক্তিপণ দাবি করে। কিন্তু মুক্তিপণ দিতে না পারায় সামরিক বাহিনী তাঁর পরিবারকে হত্যা করে বলেও জানান তিনি। হামিদা বেগম বলেন, ‘আমাদেরকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসতে হয়েছে। তাঁরা আমাদেরকে স্বাধীনভাবে চলতে দেয় না। আমরা সেখানে সবকিছু থেকে বঞ্চিত। সামরিক বাহিনী আমাদের লোকজনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে এবং মুক্তিপণ দাবি করছে। না দিতে পারলে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে তাদেরকে।’ ‘সহিংসতা শুরু হওয়ার পর আমরা সব হারিয়েছি’, বলেন হামিদা। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদেরকে এখন আধপেট খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।’ তবে এসব বিষয়ে মিয়ানমার সরকার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি বলেও সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামিদা বেগমের মতোই বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে অনিবন্ধিত কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া আরেকজন রাবেয়া খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে দীর্ঘ পথ হেঁটে আসতে হয়েছে। পাহাড়, জলাভূমি, ধানক্ষেত পার হয়ে আমরা বাংলাদেশে এসেছি।’ ‘আমি আটদিন আগে বাড়ি ছেড়েছি। (শনিবার) আজ ক্যাম্পে এসে পৌঁছেছি’, যোগ করেন রাবেয়া খাতুন। ক্যাম্পে পৌঁছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেলেও বিপদ কাটেনি রোহিঙ্গাদের। রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা যুবক মোহাম্মদ হারুন বলেন, ‘আমাদের কোনো খাবার নেই, কাপড়-চোপড়ও নেই। আমরা গৃহহীন।’ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বাড়িঘর পুড়িয়ে ও ভেঙে দিয়েছে, খাবারের উৎসও ধ্বংস করে দিয়েছে উল্লেখ করে হারুন বলেন, ‘সামরিক বাহিনী সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন সেখানে গণহত্যা চলছে।’ হারুন আরো বলেন, ‘মিয়ানমারে অনেক আদিবাসী অধিবাসী রয়েছে। কিন্তু সরকার শুধু রোহিঙ্গাদেরকেই ঘৃণা করে।’ পালিয়ে আসাদের মধ্যে কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট নৌকায় করে নদী ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে নৌকাডুবিতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। এ পর্যন্ত নাফ নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ৪০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৪০০ শতাধিক রোহিঙ্গা হত্যার মতো মানবিক বিপর্যয়কর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ সেই অবস্থান থেকে সরে আসার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অ্যান্তোনিও গুতেরেজ এই ঘটনাকে এ বছরের সহিংসতার সবচেয়ে খারাপ নজির বলেও উল্লেখ করে ‘প্রবল চাহিদার মুখে’ রাখাইন থেকে সীমান্ত পেরিয়ে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নাগরিকদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যও বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেছেন। এর আগে ২০১২ সালের জুনেও রাখাইন রাজ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আক্রান্ত হয়েছিল। তখন প্রায় ২০০ রোহিঙ্গা নিহত হন। ওই সময় দাঙ্গার কবলে পড়ে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর