বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৭, ৪ কার্তিক ১৪২৪, ২৮ মুহাররম, ১৪৩৯ | ১০:০১ অপরাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
সোমবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৬ ০৩:০৭:৪০ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, ৯৫ কোটি টাকার দরপত্রের ভাগ নিয়ে অস্থিরতা

প্রায় ৯৫ কোটি টাকার দুটি ভবন নির্মাণের দরপত্রকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষে একের পর এক পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত দুই মাসে অন্তত পাঁচবার দুই পক্ষে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৯ অক্টোবর রাতে ক্যাম্পাসের ২ নম্বর গেট এলাকায় কেন্দ্রীয় এক নেতাসহ ছাত্রলীগের চার নেতার বাসায় তাণ্ডব ও লুটপাট চালানো হয়।

হামলার এসব ঘটনার সঙ্গে দরপত্রের ভাগ-বাঁটোয়ারার বিষয়টি জড়িত বলে ছাত্রলীগের এক পক্ষের নেতারা দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, দরপত্রের ভাগ-বাঁটোয়ারার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাও জড়িত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি মো. মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘টেন্ডারবাজিতে ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপু ও তাঁর অনুসারীরা সরাসরি জড়িত। তাঁদের অপকর্মের প্রতিবাদ করায় আমাদের বাড়িতে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও টেন্ডারবাজিতে জড়িত। প্রশাসনের পছন্দের প্রতিষ্ঠানই নির্মাণকাজের কার্যাদেশ পাচ্ছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আরেক সহসভাপতি মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘টেন্ডারবাজির ভাগ-বাঁটোয়ারায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জড়িত। প্রশাসন ছাত্রলীগের একটি অংশকে ব্যবহার করে আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। পুলিশকেও প্রশাসন ব্যবহার করছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের দরপত্র ৭৫ কোটি টাকা। আর জননেত্রী শেখ হাসিনা হলের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের দরপত্র ২০ কোটি টাকা। দুটি দরপত্রের শিডিউল (ফরম) বিক্রি করা হয় ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ফরম কিনতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর থেকে। ফরম জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২৭ সেপ্টেম্বর।

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কাউকে দরপত্রের ফরম কিনতে না দেওয়ার অভিযোগ তোলে ছাত্রলীগেরই একটি অংশ। অনিয়মের প্রতিবাদে প্রথমে তাঁরা প্রথমে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন। পরে গত ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে অবরোধের ডাক দেন। এর জের ধরে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত দুই পক্ষে চার দফা সংঘর্ষ হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উপদপ্তর সম্পাদক মিজানুর রহমান, উপক্রীড়া সম্পাদক মাহবুবুর রহমানসহ চারজন আহত হন।

চেষ্টা করেও দরপত্রের ফরম কিনতে না পারা দুজন ঠিকাদার নাম না প্রকাশের শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রলীগের বড় একটি অংশের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজেদের পছন্দের বাইরে অন্য কাউকে ফরম কিনতে দেয়নি।

দরপত্রের ভাগ-বাঁটোয়ারাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে গত ২৯ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুর রব হলের সামনে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি তাইফুল হককে। এর চার ঘণ্টা পর ক্যাম্পাসের ২ নম্বর গেট এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরী, সহসভাপতি মো. মামুনসহ চার নেতার বাসা এবং আশপাশের আরও চারটি বাড়িতে তাণ্ডব ও লুটপাট চালানো হয়। হামলার শিকার ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপুর অনুসারী শতাধিক নেতা-কর্মী এসব ঘটনায় জড়িত। এর আগে হামলার শিকার তাইফুল সভাপতির অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

ক্যাম্পাসে চলমান অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মারপিটের সঙ্গে টেন্ডারের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপুর। তিনি বলেন, ‘আমি টেন্ডারের ভাগ পাইনি।’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, মেসার্স দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স-জিকেবিএল (জেভি) নামের প্রতিষ্ঠানকে নতুন কলাভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হচ্ছে। ৭৫ কোটি টাকার এই দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সরকারি একজন প্রকৌশলীকে শেষ মুহূর্তে রাখা হয়নি। ওই প্রকৌশলী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র যাচাইয়ের পরামর্শ দেওয়ায় তাঁকে বাদ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। আর শেখ হাসিনা হলের কার্যাদেশ পাচ্ছেন মেসার্স মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী।

মেসার্স মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী প্রতিষ্ঠানের মালিক মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘নগরের সিআরবি এলাকার জোড়া খুনের (২০১৩ সালের ২৪ জুন রেলওয়ের দরপত্র জমা নিয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষে দুজন নিহত হন) এক আসামি আমার কাছে চাঁদার জন্য বসতে চেয়েছিল। আমি তাকে পাত্তা দিইনি।’ মঞ্জুরুল আলমের বাড়ি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অদূরে মদনহাট এলাকায়। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

আর মেসার্স দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্সের স্বত্বাধিকারী ফজলুল করিম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ৭৫ কোটি টাকার কাজের জন্য বিবেচিত হয়েছি।’ এর বেশি কিছু তিনি আর বলতে চাননি।

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘৭৫ কোটি টাকার দরপত্র উন্মুক্ত করার সময় আমি ছিলাম। দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী সাপ্তাহিক বন্ধের দিন এ-সংক্রান্ত সভা ডাকার কথা আমাকে জানিয়েছিলেন। আমি খোলার দিন সভা ডাকার অনুরোধ করি। পরে অজ্ঞাত কারণে আমাকে মূল্যায়ন কমিটিতে ডাকা হয়নি।’

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি থেকে প্রকৌশলীকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক বড় কাজ বলে আমরা সীতাকুণ্ডের প্রকৌশলীকে বাদ দিয়ে অন্য লোককে অন্তর্ভুক্ত করেছি। যেন দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতার অভিযোগ না ওঠে।’ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দরপত্র কিনতে দেওয়া হয়নি—এ অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘কেউ যদি দরপত্রের ফরম নিতে না পারেন, সেটার জন্য আমরা দায়ী নই। সব নিয়ম মেনেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করেছে। যাঁরা টেন্ডার পাননি তাঁরা টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন টেন্ডারের ভাগ পেয়েছেন বলে অনেককে দিয়ে বলাচ্ছেন।’

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলোর তদন্ত করেছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। চার সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি কাজী এনায়েতকে। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘টেন্ডারের (দরপত্র) বিষয়টি নিয়ে বিরোধের কথা আমাদের বলেননি। তবে অন্য জায়গা থেকে টেন্ডার নিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি আমি শুনেছি।’

দুটি ভবনের নির্মাণকাজের দরপত্র নিয়ে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে বলে জানান চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাম না প্রকাশের শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি অংশ এতে সরাসরি জড়িত থাকতে পারে। ছাত্রলীগের একটি অংশ দরপত্রের ভাগ নিয়ে একমত না হওয়ায় ক্যাম্পাসে অস্থিরতা ও রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিকভাবে দ্রুত বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত।

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর