শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৭, ১৫ বৈশাখ ১৪২৪, ১ সাবান, ১৪৩৮ | ১২:২১ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ ০৬:১১:৪০ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

ট্রাম্পের প্রথম আপস

গৌতম দাস


 

 
 
হাওয়া কি এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে? অনানুষ্ঠানিক আলাপে আমরা কাউকে যেমন পাগলা বলি, ঠিক তেমন আমেরিকান নতুন প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে নিজের নামের আগে আমাদের দেশী ভাষায় এই ‘পাগলা’ বিশেষণ লাগিয়ে ফেলার মতো কাজ করেছেন- পাগলা ট্রাম্প। তো সেই ব্যক্তি কি এত তাড়াতাড়ি চীনের ইস্যুতেই ঠাণ্ডা আর থিতু হয়ে গেলেন? হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতি থেকে জানা যাচ্ছে, ৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেছিলেন এবং তার সাথে কথা বলেছেন। যে সে কথা নয়; ওই বিবৃতির ভাষা অনুযায়ী, “এক ‘দীর্ঘ ফোনালাপ’ করেছেন। বিস্ময়কর তথ্য আরো আছে। একই বিবৃতির আরো ভাষ্য হলো, ‘চীনা প্রেসিডেন্ট শি’র অনুরোধে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘একচীন নীতি’কে সম্মান জানাতে একমত হয়েছেন।... চীন ও আমেরিকা উভয় রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা এখন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষিতে বসবেন।” এ থেকে বোঝা গেল, অন্তত একটা ইস্যুতে ট্রাম্পের অপরিপক্ব হম্বিতম্বি এমনভাবে শেষ হলো যে, ট্রাম্পের আমেরিকাকে একচীন নীতিতে আপসরফা করতে হলো। 
একচীন নীতি মানে হলো, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। এই পূর্বশর্ত পূরণ করার পরই এর ভিত্তিতে চীন যেকোনো রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করে থাকে। আমেরিকার সাথে মাওয়ের চীন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল গোপনে ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে। পরের বছর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফর দিয়ে সেটা প্রকাশ্যে ঘটেছিল। এ ঘটনার পরম্পরায় ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সম্পর্ক শুরু করেছিল চীন-আমেরিকা। বলা বাহুল্য, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এই শর্ত মেনেই আমেরিকা তাতে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক সাক্ষাৎকারে এমন বয়ান দেয়া শুরু করেছিলেন যে, আমেরিকা কেন সেই ‘পুরনো কমিটমেন্টে আটকে’ থাকবে। প্রশ্নের ভঙ্গিতে তিনি কথাটা তুলেছিলেন। এর আগে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট তাকে স্বাগত জানানোর উছিলায় ফোনকল করেছেন বলে তাতে ট্রাম্প সাড়া দিয়ে কথা বলেছিলেন। এ রকম অন্তত আরো তিনটি ঘটনা আছে যেখানে ‘একচীন নীতি’ ট্রাম্প মানতে চান না অথবা মানবেন না কিংবা চীনের সাথে ট্রাম্প সঙ্ঘাতে যেতে চান, তা প্রকাশ পেয়েছিল। যেমন ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসন তার প্রার্থিতা সিনেটে অনুমোদনের শুনানিতে জবাবে, সাউথ চায়না সি থেকে চীনাদের তাড়ানোর জন্য সামরিক বলপ্রয়োগের কথা বলেছিলেন। জন বোল্টন জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মে (২০০১-২০০৫) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। তাইওয়ানের পক্ষে লবি করার বড় প্রবক্তা মনে করা হয় তাকে। কূটনীতিতে বলপ্রয়োগ বা চাপে ফেলে আমেরিকান নীতির পক্ষে অন্য রাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ে সিদ্ধহস্ত এই কূটনীতিক। ট্রাম্পের বিজয়ের পর তিনি সরব হয়ে উঠেছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা সেক্রেটারি অব স্টেট) হবেন হয়তো। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎও করেছিলেন। এ ছাড়া, স্টেফান ইয়েটস বুশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি ট্রাম্পের পরোক্ষ দূত হিসেবে তাইওয়ান সফরে গিয়ে সেখান থেকে ফিরেই তিনিই প্রথম তর্ক উঠান যে, ‘একচীন নীতি’তে দেয়া প্রতিশ্রুতিতে আমেরিকাকে আটকে থাকতে হবে কেন? 
এই তিন ঘটনা ছাড়াও, চীনের অর্থনীতির উত্থানের কারণে আমেরিকানদের কাজ ও চাকরি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। ফলে ট্রাম্প আমেরিকার বাজারে চীনা পণ্য প্রবেশে ৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে তা ঠেকাবেন- এজাতীয় সস্তা জাতীয়তাবাদী স্লোগান ছিল নির্বাচনে ভোটের বাক্স ভরতে ট্রাম্পের পপুলার দাবি। এসব মিলিয়ে সত্তরের দশক থেকে দাঁড়ানো চীন-আমেরিকার গভীর সম্পর্ক এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে মনে করে দুনিয়ার সংশ্লিষ্ট সবাই শঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন। আমেরিকার কোনো ব্যবসায়ী, ওয়াল স্ট্রিট অথবা কোনো করপোরেট গ্রুপ, কেউই ট্রাম্পের সামরিক পথে অবস্থানের ইচ্ছা বা সঙ্ঘাতমূলক পন্থা গ্রহণকে সমর্থন করতে পারেনি, তাতে চীন-আমেরিকান সঙ্ঘাত তাদের অবস্থানের যে দিকেই থাকুক। কিন্তু কেউই নিশ্চিত থাকতে পারছিলেন না যে, এই পাগলা প্রেসিডেন্ট শেষে হঠাৎ কী করে বসেন। ট্রাম্প আর শি জিনপিংয়ের ফোনালাপ তাই সবাইকে একধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। 
এ প্রসঙ্গে চীনা অবস্থান শুরু থেকেই ছিল খুবই পরিপক্ব ও মাপা। ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের তারিখ ছিল ২০ জানুয়ারি। ফলে ওই তারিখের আগে মিডিয়ায় যতই নতুন নতুন উসকানিমূলক খবর নিয়মিত প্রকাশ পাক না কেন, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিল। কেবল বলেছিল, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার আগে সব মিডিয়া রিপোর্টই জল্পনাকল্পনামূলক, আনুষ্ঠানিক কিছু নয়। তাই অনুমাননির্ভর বিষয়ে চীন কথা বলবে না। কেবল ৮ নভেম্বর ২০১৬ ট্রাম্প নির্বাচনে জিতেছেন। এই ফল প্রকাশের পর থেকে বলে এসেছেন, গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে চীন-আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভাগ্য এক সুতায় বাঁধা পড়েছে। ফলে পরস্পর ডায়লগ করে এক সাথে হাঁটতে হবে। এ কথা ক্রমাগত প্রচার করে গেছেন। আর ট্রাম্পের একচীন নীতি নিয়েও আবার দরকষাকষি করতে চাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করার পর পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, ‘চীনের একচীন নীতি কোনো দরকষাকষির বিষয়ই নয়’। তবে ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে দুটো কারণে চীন প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হতে শুরু করেছিল। তখন থেকে সাধারণভাবে বললে, চীন গাজর-লাঠি (হয় গাজর খাও, না হলে লাঠির বাড়ি) নীতিতে চলে যায়। তা হলো, আমেরিকান লোকদের কাজ বা চাকরির সমস্যা নিয়ে আলোচনায় সমাধান সম্ভব। চীন সেখানে ছাড় দিতেও রাজি। ওবামা আমলে ২০১১ সালে এমন আপসরফা হয়েছিল। কিন্তু এটাকে উছিলা করে সঙ্ঘাতের রাস্তা সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনার পথ ধরলে মুখোমুখি মোকাবেলার পথে যাওয়া হবে। এটা হলো অনেকটা এক জামাইয়ের বড়লোক শ্বশুরের মেয়ে বিয়ে করার অবস্থা। বউ-সন্তান নিয়ে জামাইয়ের দিন-খারাপ কাটছিল না। হঠাৎ করে জামাইয়ের মনে হলো, বিয়ের আগের তুলনায় তার সংসার খরচ বেড়ে গেছে। তাই সে বউ তালাক দিতে চায়। এ কথা শুনে শ্বশুর প্রথমে জামাইকে তোষামোদ করে আর মিষ্টি কথা বলে তাকে তালাকের সিদ্ধান্ত থেকে সরানোর চেষ্টা করছিলেন। শেষে না পেরে একপর্যায়ে শ্বশুর বললেন, হয় তুমি আলাপ আলোচনায় আসো, তাতে সংসার চালানোর অর্থে টান পড়লে ভর্তুকি দেয়া হবে। কিন্তু তুমি যদি না মানো, তবে তোমাকে লাঠিপেটা করা হবে।’ এই গাজর-লাঠির নীতিতে কাজ হয়েছিল। জামাই আলোচনার টেবিলে বসে সব সমস্যার সমাধান করেছিল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প বিরতিহীন গরম কথা থেকে অন্তত একটা ইস্যুতে এই প্রথম পিছু হটলেন। কারণ ট্রাম্পের এখন সেই জামাইয়ের দশা। চীন দক্ষিণ চীন সাগর রক্ষা নিয়ে সামরিক মহড়াসহ যা-ই করুক আর না করুক, চীনের মূল উদ্বিগ্নতা ছিল আরো ব্যবহারিক। কী সেটা?
কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ট্রাম্পের ফোনালাপ মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায়। নির্ধারিত সময় অর্ধেক শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প ফোন রেখে দিয়েছিলেন এবং ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় হঠাৎ থেমে যাওয়া সেই ফোনালাপের ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। তাতে ‘পাগলা’ ট্রাম্পের সাথে চীনা প্রেসিডেন্ট কিভাবে কথা বলবেন- ট্রাম্প যদি অর্ধেক কথা বলেই ফোন রেখে দেন? এরপর যদি সব ফাঁস হয়ে যায় তবে তো তিনিও বিব্রত হবেন, এই ভয় পেয়ে বসেছিল শিং জিনপিংকে। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে চীন-আমেরিকার পররাষ্ট্র বিভাগ বসে আগেই সব কিছু ঠিক করে নেন। তিনি কিভাবে কথা বলবেন, কতটুকু কোথায় ট্রাম্প রাজি হবেন ইত্যাদি নিয়ে আগেই কথা বলে নিয়েছিলেন। সেই ফরম্যাট মোতাবেক আগের দিন মানে বুধবার ট্রাম্পের অফিস সংবাদমাধ্যমকে জানায়, পরের দিন তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে কথা বলবেন। এরপর তাদের ফোনালাপ শেষে দুই পররাষ্ট্র অফিস থেকে দুটো আলাদা পূর্বনির্ধারিত বিবৃতি যায়। সব কিছু আগেই আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। সবই পাগলা ট্রাম্পের কৃতিত্ব। 
এ থেকে অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার হলো যে, এখনো ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু লোক আছেন যারা ট্রাম্পকে পরামর্শ শুনতে বাধ্য করতে পারেন। ট্রাম্প কি এখন থেকে থিতু হয়ে কথা বলবেন? যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে করে কথা বলবেন?
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর