সোমবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ৮ কার্তিক ১৪২৪, ২ সফর, ১৪৩৯ | ০১:৩১ অপরাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
শুক্রবার, ১৩ অক্টোবর ২০১৭ ০৫:১০:৩০ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

সালমানের সৌদি আরব বদলে যাচ্ছে!

বাদশাহ সালমানের শাসনামলে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তনগুলো নিঃসন্দেহে চোখে পড়ার মতো। সৌদি আরব সত্যি বদলে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে নানান বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। বছর তিনেক আগে সৎভাই আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে সৌদি আরবের সিংহাসনে আরোহণ করেন সালমান। সিংহাসনে বসেই গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল আনেন তিনি। ভাতিজা মোহাম্মদ বিন নায়েফকে করেন ক্রাউন প্রিন্স, অর্থাৎ রাজবংশের পরবর্তী উত্তরসূরি। আর ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে করেন ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স। তাঁকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ দেওয়া হয়। পছন্দের ছেলেকে আগে থেকেই প্রস্তুত করছিলেন সালমান। সে অনুযায়ী চলতি বছরের জুনে বাদশাহ তাঁর ৩১ বছর বয়সী ছেলেকে ক্রাউন প্রিন্স বা যুবরাজ ঘোষণা করেন। উত্তরসূরির পদ থেকে সরিয়ে দেন ভাতিজা নায়েফকে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাদশাহ ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছেন। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স সৌদি আরবের পরিবর্তনে তরুণ প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে। এই অভিযান দেখভালের দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। ইয়েমেনে বিমান হামলায় বেসামরিক লোকজনের ব্যাপক প্রাণহানিতে সমালোচিত হচ্ছে সৌদি আরব। তবে এই সমালোচনায় কান দিচ্ছে না রিয়াদ। ইয়েমেন সংকটে সৌদি আরবের ভূমিকা রিয়াদের অধিক আগ্রাসী নীতি অনুসরণের ইঙ্গিত দেয়। হবু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন বুঝতে সবাই যখন গলদঘর্ম, তখন সৌদি আরব বিশ্বকে এক খেল দেখাল। ২০১৭ সালের মে মাসে ট্রাম্প তাঁর প্রথম বিদেশে সফরে সৌদি আরব যান। ট্রাম্পের প্রথম বিদেশ সফরের জন্য সৌদি আরবকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি রিয়াদের জন্য একটা বড় কূটনৈতিক বিজয়। ট্রাম্পের এই সফর আয়োজনে কারিগরের ভূমিকায় ছিলেন মোহাম্মদ বিন সালমান। ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে কয়েক শ কোটি ডলার মূল্যের চুক্তি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ১১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রির চুক্তিও আছে। এই সফরের পর বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে এক নতুন সৌদি আরবের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। তারা বিশ্বকে তাদের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও জোরদার করতে সৌদি আরবকে ইদানীং বেশ তৎপর দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ ইরান ও তার মিত্রদের জব্দ করতে রিয়াদ সব ধরনের চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। নিজের দল ভারী করতে সামরিক ও আঞ্চলিক জোট করছে সৌদি আরব। গত জুনে সৌদি আরব ও তার কয়েকটি মিত্র দেশ একযোগে কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছেদ করে। তারা কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদদ ও ইরানের খুব ঘনিষ্ঠ হওয়ার অভিযোগ আনে। তারা কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। কাতারের সঙ্গে স্থল, নৌ ও আকাশপথের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব। সৌদি জোটের আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে দোহা। কাতারকে একঘরে করার পদক্ষেপ আরব বিশ্বে সৌদি আরবের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টারই অংশ। তেল দিয়ে বেশি দিন চলা যাবে না—এটা বোধ করি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে সৌদি আরব। এই বোধোদয় থেকেই ২০১৬ সালের এপ্রিলে সৌদি সরকার বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা অনুমোদন করে। ‘ভিশন ২০৩০’ নামের এই মহাপরিকল্পনার পেছনে আছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য দেশটির তেলনির্ভর অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। তেলের রাজস্বের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। তেলের বাইরে অন্য খাতে ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি অংশ বেসরকারীকরণও এই মহাপরিকল্পনার অন্তভুক্ত। ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়িত হলে সৌদি অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। নারীর অধিকারের প্রশ্নে রক্ষণশীল সৌদি আরবের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত সবাইকে রীতিমতো বিস্মিত করেছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরব প্রথমবারের মতো দেশটির নারীদের প্রার্থী ও ভোটার হওয়ার সুযোগ করে দেয়। গত মাসের শেষ দিকে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতিসংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করেন সৌদি বাদশাহ। আদেশটি ২০১৮ সালের জুনে কার্যকর হবে। এ মাসেই সৌদি আরবের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের মুঠোফোন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া সম্প্রতি দেশটির একটি স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো নারীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের এসব পদক্ষেপ নারীর অধিকারের ব্যাপারে দেশটির কট্টর নীতিতে কিছুটা হলেও নমনীয়তার আভাস দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের দোস্তি বেশ পুরোনো। সামরিক সহায়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে রিয়াদ এত দিন ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে আসছিল। এবার রিয়াদের ওয়াশিংটন-নির্ভরশীলতার নীতিতেও বদল লক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে সৌদি আরব। মস্কোর সঙ্গে দীর্ঘ দিনের শত্রুতা ঘুচিয়ে বন্ধুত্বের পথে হাঁটছে রিয়াদ। চলতি মাসের শুরুর দিকে রাশিয়া সফর করেন সৌদি বাদশাহ। এই প্রথম কোনো সৌদি বাদশা রাষ্ট্রীয় সফরে রাশিয়া গেলেন। বাদশার সফরকালে রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে সৌদি আরব। দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি চুক্তিও হয়েছে। বাদশাহ সালমানের রাশিয়া সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। তাঁর মস্কো সফর রাশিয়ার ব্যাপারে সৌদি আরবের নতুন দৃষ্টিভঙ্গিই বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনসহ অন্যদের জন্যও এই সফর একটি বার্তা—রিয়াদের নীতির বদল ঘটছে।

আরো খবর