শুক্রবার, ২৩ জুন ২০১৭, ৯ আষাঢ় ১৪২৪, ২৮ রমজান, ১৪৩৮ | ০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
রোববার, ১৮ জুন ২০১৭ ০২:১৯:০৬ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

কাতার সঙ্কট: উপমহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতি কোন পথে?

মুসলিম ব্রাদারহুড ও হামাসসহ কয়েকটি জঙ্গিগোষ্ঠীকে মদদ দেয়ার অভিযোগে গত সপ্তাহে সৌদির নেতৃত্বে উপসাগরীয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের হাইড্রোকার্বন সমৃদ্ধ দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। পাশাপাশি তারা দেশটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ করে দিয়েছে। মার্কিন তদন্ত সংস্থাগুলো মনে করছে কাতারের আমিরের নামে করা হ্যাকারদের একটি ভূয়া ও উত্তেজক বার্তা এই সঙ্কটকে আরো উসকে দিয়েছে। কিন্তু কাতারের সঙ্গে পারস্য উপসাগরের বৃহত্তর সুন্নি আরব প্রতিবেশিদের দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের এই বিরোধটি অনেকটাই উদ্ঘাটিত। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যরা প্রায় কাতারের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া আউটলেট আল জাজিরা ও সৌদি আরবের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সঙ্গে কাতারের সুষম বাণিজ্যিক সম্পর্কের অভিযোগ করেছে। কেউ কেউ মনে করছেন বর্তমান সঙ্কট হচ্ছে সন্ত্রাসী অর্থায়নের একটি উৎসকে দমিয়ে রাখার একটি সহজ গল্প। আবার আরেকটি গ্রুপ মনে করছে, এটি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট এই দেশটির সফল অগ্রযাত্রাকে রুখে দেয়ার সর্বশেষ প্রচেষ্টা। কয়েক দশক আগের উত্তেজনা তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ দেশ কাতার অনেক আগে থেকেই বাহিরের রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অটোমান তুর্কিরা দেশটিতে প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিংশ শতাব্দীর বেশিরভাগ সময় পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত কাতার ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তেল ও গ্যাস একসময়ের পরাধীন রাষ্ট্রটিকে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। তাদের মাথা পিছু আয় বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ। উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র দেশটি পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে, কাতারের নেতাদের প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন আল-থানি পরিবারের। বর্তমানে তামিম বিন হামাদ আল-থানি দেশটির দায়িত্বে রয়েছেন। তারা রক্ষণশীল প্রভাবিত প্রতিবেশি সৌদি আরবের আধিপত্যবাদের বাইরে শাসন করছেন। ফিরে দেখা গত কয়েক দশরের উত্তেজনার হাইলাইট: • ১৯৯৬ সালে কাতার উপগ্রহ নিউজ চ্যানেল আল জাজিরা চালু করে এবং এই অঞ্চলের সংবাদ কভারেজের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা নিয়ে আসে। আল জাজিরা তার বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে আরব নেতৃবৃন্দকে অস্থির রাখে। চ্যানেলটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে আরবের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বিতর্ক; যা পূর্বে অনেকেরই অজানা ছিল তা সবার সম্মুখে তুলে ধরে। ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি সংঘাত চলাকালে বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে কভারেজ দেয় চ্যানেলটি। এটিও অনেকেরই মাথা ব্যাথার কারণ ছিল। • ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে কাতার আবারো সৌদি আরবকে উস্কে দেয়। দেশটি ইরানের সঙ্গে বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস শেয়ার করছে। কাতারের নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্রটি ইরানের জলভাগের মধ্যে বিস্তৃত; যেটি ‘সাউথ পার্স ফিল্ড’ হিসাবে পরিচিত। কাতার বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। • ২০১১ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিশেষকরে মিশর, লিবিয়া ও সিরিয়াতে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। সেসময় কাতার দ্রুত আরব বসন্তের বিদ্রোহকে কাজে লাগায়। দোহা মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন করে। পরে সংগঠনটির নেতা মোহাম্মেদ মুরসি দীর্ঘদীনের ক্ষমতাসীন হোসনি মুবারককে হটিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, মিশরের সামরিক বাহিনীকে পিছন থেকে রিয়াদ সর্বাত্মক সমর্থন যোগায়, যা নির্বাচিত হওয়ার পর এক বছরের মধ্য মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ২০১৪ সালের পরিস্থিতিকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যায়। সৌদির ক্ষমতাসীন পরিবার আরব বসন্তের বিদ্রোহকে খারাপ চোখে দেখে এবং এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ও তার নিজস্ব শাসনের জন্য এটিকে হুমকিস্বরূপ মনে করে। এই অঞ্চলে সৌদি তার নিজস্ব কর্মকাণ্ড বজায় রাখতে স্থল ও কূটনৈতিক প্রদক্ষেপ গ্রহণ করে। লিবিয়া ও সিরিয়াতে যুদ্ধরত বিভিন্ন সংগঠনকে সৌদি আরব ও কাতার সমর্থন করার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। ২০১৪ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় দেশগুলো কয়েক মাসের জন্য কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করে এবং পরিস্থিতিকে আরো খারাপের দিকে যেতে হুমকি দেয়। গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রিয়াদ সফরের পর সৌদি আরব বর্তমানে পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করে তুলেছে। তারা অতীতের তুলনায় কাতারের কাছ থেকে অনেক বেশি ছাড়ের দাবি জানাচ্ছে। সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিনিময়ে তারা আল জাজিরা বন্ধ করে দেয়া ও হামাসের নেতাদের দেশটি থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছে। এ বিষয়ে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের দোহা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক ও অঞ্চল বিদ্যার প্রধান মেহরান কামরাভা বলেন, ‘২০১৪ সালের কূটনৈতিক দাবির তুলনায় বর্তমানের দাবিগুলো আরো অনেক বেশি নাটকীয়।’ এবার সৌদিরা কাতারের একমাত্র স্থল সীমান্তটি বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ করে দেয়া ওই সীমান্ত দিয়ে কাতার প্রায় ৪০ শতাংশ আমদানি করে থাকে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো কাতারের সঙ্গে আকাশ ও সমুদ্র পথে রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়াও, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে থাকা কাতার প্রবাসীদের দেশগুলো ত্যাগ করতে দুই সপ্তাহ দেয়া হয়েছে এবং ওই তিনটি দেশের নাগরিকদের কাতার ত্যাগ করার জন্য ২০ জুন পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। এর বাইরে বিরোধটি আরো গভীর বলে মনে করেন কামরাভা। তিনি বলেন, ‘এবারের মতানৈক্য আরো বেশি ব্যক্তিগত বলে মনে হচ্ছে। শত্রুতার ধরনে কাতারিরা একটু হলেও বিস্মিত হয়েছে।’ কুয়েত চেষ্টা করেছে মধ্যস্থতা করতে। এব্যাপারে ফরেন রিলেশন্স বিষয়ক সিনিয়র কাউন্সিলর ফিলিপ গর্ডন বলছেন বর্ধিত উত্তেজনা এবং এতসব কঠোর দাবি পূরণে কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো অনেক বেশি কঠিন হবে। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর দাবিগুলো হচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুড ও হামাসের সদস্যদের কাতার থেকে বহিষ্কার করতে হবে এবং আল জাজিরার বন্ধ করতে হবে। এসব দাবি সত্যিকার অর্থে বেশ বড় দাবিই বলা চলে; যা কাতারের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।’ তিনি বলেন, যদিও ইরানের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক ছিন্নের কথা তাদের দাবিগুলোর মধ্য উল্লেখ করা হয়নি। অন্যদিকে, ট্রাম্পের রিয়াদ সফর শেষ করার পরপরই এ ঘটনা ঘটে। এরপর এই অঞ্চলে সৌদি আরবের আচরণ সম্পর্কিত অভিযোগের বিষয় উল্লেখ না করে ট্রাম্প বেশ কয়েকটি মন্তব্য করেন, বিশেষকরে কাতারকে টার্গেট করে। উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে আরো বেশি সহযোগী হতে কাতারকে বাধ্য করার জন্য তারা লিভারেজ করছে। দুবাই-ভিত্তিক নর্থ-ইস্ট ও উপসাগরীয় মিলিটারি বিশ্লেষক রিয়াদ কাওয়াজি বলেন, ‘একটি ‘ধূসর অঞ্চলে’ কাতার তার কর্মকাণ্ড পরিচালিত করছে। দেশটি তার সুন্নি মুসলিম প্রতিবেশিদের কাছে আনুগত্যের অঙ্গীকার করলে ইসলামি জঙ্গিদের অব্যাহত সমর্থন ও ইরানের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘এখন কাতারকে বাছাই করতে হবে তারা কোনটি গ্রহণ করবে।’ এই সঙ্কট কি আরো একটি নতুন জোট গঠনের দিকে যাচ্ছে? চলমান এই সঙ্কট কাতারকে ইরানসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের সাহায্য চাইতে বাধ্য করেছে। ইরানি মিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, দেশটি জাহাজের মাধ্যমে দোহায় ‘মানবিক সাহায্য’ পাঠাবে। রাশিয়াও কাতারকে সমর্থন করেছে এবং তুরস্কও খাদ্য প্রেরণ করতে প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান বলেছেন, ‘কাতারে সঙ্গে খুব বড় ভুল করা হচ্ছে।’’ তিনি দেশটিকে অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়টিকে অত্যন্ত ‘অমানবিক’ ও ইসলামি মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বলে মন্তব্য করেছেন। কাতারের ওপর এই সব চাপ দেশগুলোর পরিকল্পনার উল্টো ফল হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। দেশটিকে রাশিয়া, তুরস্ক এবং ইরানের সঙ্গে একটি নতুন জোটের দিকে ধাবিত করতে পারে। যা হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন উদ্দেশ্যের একটি। এই বিতর্ক সম্পর্কে ওয়াশিংটন একটি মিশ্র বার্তা পাঠিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন সবাইকে শান্ত থাকতে এবং সংলাপের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, কাতারের সন্ত্রাসী অর্থায়নের বিষয়টি শেষ হওয়ার সময় এসেছে। এদিকে, পেন্টাগন কাতার ভিত্তিক আঞ্চলিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের আদেশ বজায় রাখছে। এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করার দোহার সঙ্গে শুধু ১২ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানা গেছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক স্টিভেন কুক বলছেন, বিতর্ক মীমাংসার প্রচেষ্টা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর সঙ্গে একাধিক প্রশ্নের এখনো পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ‘তুর্কি ত্রাণ তহবিল কতটা টেকসই?’ উপসাগরের অন্য পাশ থেকে ইরানীরা এই সমস্যাটি কাজে লাগানোর জন্য কতদূর যেতে ইচ্ছুক? এসব প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সত্যিই কি তারা মুসলিম ব্রাদারহুড ও হামাসের সদস্যদের বহিষ্কার করতে পারে? তিনি উল্টো প্রশ্ন রাখেন।

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর