শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, ১ মুহাররম, ১৪৩৯ | ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
রোববার, ১৬ জুলাই ২০১৭ ০৭:০৭:০৪ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

পাকিস্তানে শিশুদের দাসত্ব ঘোচাতে যেভাবে প্রাণ দিয়েছিল পাকিস্তানের এক কিশোর

মাত্র চার বছর বয়সে ইকবাল মাসিহকে কার্পেট বোনার কাজে দাস হিসাবে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। পরে ওই শৃঙ্খলিত জীবন থেকে পালিয়ে অল্প বয়সেই ইকবাল হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একজন শিশু অধিকার সংগ্রামের প্রবক্তা । ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উত্তর পশ্চিম পাকিস্তানের শেখোপুরায় এক বৈঠক ডেকেছিল বন্ডেড লেবার লিবারেশন ফ্রন্ট সংক্ষেপে বিএলএলএফ- যারা দক্ষিণ এশিয়া থেকে দাসত্ব নির্মূল করার জন্য তখন আন্দোলন ও প্রচারণা চালাচ্ছিল। বিএলএলএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা এহসানউল্লাহ খান বলছিলেন ওই বৈঠকে যোগ দিতে এসেছিল ছোট্ট একটি ছেলে। ‘'ছেলেটির মুখ দেখে আমার মনে হল সে কিছু বলতে চায়। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না।'' ছেলেটির বয়স মাত্র ১০, উচ্চতায় ৪ফুট। ''ছেলেটার চোখেমুখে ছিল ভয়, আর চেহারা ছিল খুব নোংরা। আমি ওর সঙ্গে দশ মিনিটের মত কথা বললাম। ও চুপ করে রইল। কিন্তু আমি ওর কথা শুনতে চাইছি বুঝতে পারার পর ও মুখ খুলল। আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আমি ইকবাল'। আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘তুমি কী কর?’ ও বলল ‘কার্পেট বুনি'। জানতে চাইলাম- ‘কতদিন এ কাজ করছ'? ও বলল চার বছর বয়স থেকে।'' পাকিস্তানে বহু শিশুকে কার্পেট বোনার কাজে ব্যবহার করা হয়। পাকিস্তানে এরকম একটি কার্পেট বোনার কারখানায় কর্মরত ছিলো ইকবাল। শেখোপুরায় এহসানউল্লাহ খানের সঙ্গে ওই বৈঠকে ইকবাল তার মালিকের নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে একটা ভাষণ দিয়েছিল। ''আমি কাজ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। মালিক সেখানে যেতে আমাকে নিষেধ করেছিল। আমি যখন ভাষণ দিয়ে ফিরলাম আমার মালিক বলল তোমাকে আর ওখানে যেতে দেব না। আমার মালিক সম্পর্কে তখন তখন আমার ভয় কেটে গিয়েছিল। উল্টো মালিক আমাকে ভয় করতে শুরু করল,'’ এমনটাই ছিল এহসানউল্লাহর রেকর্ড করা ইকবালের বক্তব্য । তার পরিবার স্থানীয় একজন কার্পেট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৬০০ রুপি ধার নিয়েছিল। কার্পেট কারখানার ঐ মালিকের দেনা পরিবারটি শোধ করতে না পারায় ইকবালের মা তার ছেলেকে দাস হিসাবে খাটার জন্য তার কাছে বিক্রি করে দেন। কখনও কখনও ইকবালকে এই কার্পেট কারখানায় ১৪ঘন্টাও কাজ করতে হতো। ভোর থেকে প্রায় রাত অবধি সে কাজ করতো। কারখানায় শিশুদের মারধোর করা হতো, শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। নির্মম নির্যাতন চালানো হতো। চার বছর বয়স থেকে ইকবাল এবং কারখানার অন্য শিশুরা এই জীবনেই অভ্যস্ত ছিল। অবশেষে এহসানের সংস্থার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের ফলে দাসত্ব শ্রম থেকে মুক্তি পায় ইকবাল। শেখোপুরার বৈঠকে ইকবালকে প্রথম দেখার পর সংস্থার কর্মীরা ইকবালের কর্মস্থলে যায় এবং ইকবাল ও আরও বেশ কিছু শিশুকে সেখান থেকে উদ্ধার করে আনে। ইকবাল মুক্তি পাবার পর প্রথমেই তাকে স্কুলে পাঠানোর উদ্যোগ নেন সংস্থাটি। এহসানের সংস্থা প্রায় ১১ হাজার এধরনের শিশুর জন্য যে দুশ-বিশটি স্কুল খুলেছিল তারই একটিতে যেতে শুরু করে ইকবাল। অল্পদিনের মধ্যেই ওই শিশুদের মধ্যে ইকবাল আলাদা করে নিজের একটা জায়গা তৈরি করে নেয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে শিশুশ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। তার প্রচার-কাজের জন্য ১৯৯৪ সালে ইকবাল আমেরিকায় একটি সম্মানজনক মানবাধিকার পুরস্কার পায়। পুরস্কার নেয়ার জন্য এহসানের সঙ্গে ইকবাল আমেরিকার বস্টন শহরে যায়। সেখানে ইকবালের বক্তৃতা খুবই সমাদৃত হয়েছিল। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল ইকবালকে ভবিষ্যতে পড়ার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন পাকিস্তানে স্কুলের পড়া শেষ করে ইকবাল ওখানে ভর্তি হতে পারবে। এবং চাইলে আইন পড়ে আইনজ্ঞ হতে পারবে। কিন্তু তার আকাশছোঁয়া স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কিশোর ইকবাল তখন আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরের স্কুলে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। দাসত্বের শেকলে বাধা শিশুদের কথা বলছে - তাদের মুক্তির পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু এর ফলে তখন নিজের দেশে এই স্পষ্টবক্তা কিশোরের অনেক শত্রু তৈরি হয়ে গেছে। পাকিস্তানে ফিরলে অবশেষে ইকবালকে মেরে ফেলা হয়। এখনো পাকিস্তান এবং বিশ্বের অন্যত্র এখনও দাস হিসাবে কাজ করছে লক্ষ লক্ষ শিশু। ইকবালকে অজ্ঞাতপরিচয় একজন বন্দুকধারী গুলি করে মারে। দিনটা ছিল ১৯৯৫ সালের ১৬ই এপ্রিল। ইকবাল যখন দুজন আত্মীয়ের সঙ্গে সাইকেলে ঘুরছিল, তখন কেউ তাকে গুলি করে। ইকবালের বয়স তখন মাত্র ১২। শিশুশ্রম নিয়ে কথা বলতে গিয়েই ঝরে গেল ইকবালের প্রাণ। পাকিস্তানে শিশুদের দাসত্বে বেধে কাজ করানোর প্রথার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোচ্চার হতে গিয়ে ইকবালকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর