বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭, ১৬ চৈত্র ১৪২৩, ২ রজব, ১৪৩৮ | ০৮:৩৭ অপরাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
বুধবার, ১১ জানুয়ারী ২০১৭ ০৪:৩৫:৪০ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

ইব্রাহিম পাশার সাতকাহন

‘সুলতান সুলেমান’-টিভি সিরিজের জনপ্রিয় চরিত্র ইব্রাহিম পাশা। সম্প্রতি পর্দায় তার মৃত্যু হওয়ায় তিনি আলোচিত হচ্ছেন। যদিও শুরু থেকেই তার উপস্থিতি দর্শক হৃদয়ে সাড়া ফেলেছে। প্রশংসিত হয়েছে তার অভিনয়। তিনি সিরিজটিতে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রধান উজিরের দায়িত্ব পালন করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন তুরস্কের অভিনেতা ওকান ওয়ালাবিক। এখন প্রশ্ন হলো, ইতিহাসের ইব্রাহিম পাশা বাস্তব জীবনে কেমন ছিলেন? সে সম্পর্কে অনেকেই হয়তো জানেন না। তবে ধারণা করছি, তার সম্পর্কে কৌতূহল অনেকেরই রয়েছে। এই লেখা সেই কৌতূহল মেটানোর প্রয়াস। ইব্রাহিম পাশা (১৪৯৫-১৫৩৬) ছিলেন তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের মহান সম্রাট সুলতান সুলেমান কর্তৃক নিয়োজিত প্রধান উজির। পুরো নাম পারগালি ইব্রাহিম পাশা। তিনি পশ্চিমে ফ্রেঙ্ক ইব্রাহিম পাশা এবং মকবুল ইব্রাহিম পাশা নামেও পরিচিত। ইব্রাহিম জন্মসূত্রে অর্থোডক্স খ্রিস্টান, যিনি পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। কিশোরকালে তিনি দাসত্বের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু ১৫২৩ সাল নাগাদ তিনি সুলতান সুলেমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হন। সুলেমান তাকে পূর্ববর্তী সম্রাট এবং তার পিতা সুলতান সেলিম-১ কর্তৃক নিয়োজিত প্রধান উজির পিরি মেহমেদ পাশা’র স্থলাভিষিক্ত করেন। পরবর্তী ১৩ বছর ইব্রাহিম নিযুক্ত পদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। সুলতান সুলেমানের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন এই প্রধান উজির অটোমান সাম্রাজ্যে সমসাময়িক অন্যান্য গ্র্যান্ড উজিরদের চেয়ে ক্ষমতাশালী এবং জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হন। পরিতাপের বিষয় এই যে, ১৫৩৬ সালে সুলতান সুলেমানের নির্দেশেই তাকে ‘টোপকাপ প্রাসাদে’ হত্যা করা হয় এবং তার সমস্ত সম্পদ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হয়। ইতিহাস অনুসন্ধান করে যতটুকু জানা যায়, ইব্রাহিম পাশা তৎকালীন ভেনিসের অন্তর্ভুক্ত এপিরাস শহরের পারগায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বংশ পরিচয় সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য জানা যায় না। ধারণা করা হয়, তিনি জন্মসূত্রে স্লাভিক উপভাষী ছিলেন এবং গ্রিক ও আলবেনিয় ভাষাও তিনি জানতেন। তার পিতার সম্পর্কেও সঠিক তথ্য জানা যায় না। ধারণা করা হয়, তিনি ১৪৯৯ থেকে ১৫০২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যের বসনিয়ার গভর্নর ইস্কান্দার পাশার অতর্কিত আক্রমণে বন্দি হন। ১৫১৪ সালের দিকে ইস্কান্দার পাশা শাসিত অঞ্চল এডির্ন-এ ইব্রাহিম পাশার সঙ্গে যুবরাজ সুলেমানের প্রথম সাক্ষাত হয়। সুলতান সুলেমান ১৫২০ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তখন থেকেই ইব্রাহিম পাশা বিভিন্ন রাজদায়িত্বপ্রাপ্ত হতে থাকেন। তার প্রথম দায়িত্ব ছিল সুলতানের বাজপাখি পালন। ক্রমান্বয়ে পাশা কূটনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলার ক্ষমতা এবং সামরিক অভিযানে দক্ষতার পরিচয় দিতে থাকেন এবং খুব দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে যান। এক পর্যায়ে তিনি সুলতানকে অনুরোধ করেন, তাকে যেন এতো দ্রুত পদোন্নতি না দেওয়া হয়, কারণ এতে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্র্যান্ড উজিরদের কাছে তিনি চক্ষুশূল হয়ে পড়তে পারেন। তার এই বিনয়ে মুগ্ধ হয়ে সুলতান সুলেমান ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তার শাসনামলে কখনো ইব্রাহিম পাশাকে হত্যা করা হবে না। একইসঙ্গে ইব্রাহিমকে সুলেমানের সাম্রাজ্যের ‘সিরাসাকার’ (উচ্চপদস্থ রাজ কর্মকর্তা, যার অধীনে একইসঙ্গে কূটনৈতিক এবং সেনাবাহিনী পরিচালনার ক্ষমতা থাকে) নিযুক্ত করা হয়। ১৫২৪ সালে যখন সাম্রাজ্যভুক্ত মিশরের গভর্নর হাই আহমেদ পাশা নিজেকে স্বাধীন শাসক ঘোষণা করেন, তখন ইব্রাহিম পাশা তাকে পরাজিত এবং নিহত করেন। শুধু তাই নয়, এক বছরের মধ্যে তিনি মিশরীয় সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করেন। সেই সঙ্গে সেখানকার আইন সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করেন। এক আড়ম্বরপূর্ণ এবং ব্যয়সাধ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ১৫২৩ সালে মুহসিন হাতুনকে বিয়ে করেন। হাতুন ছিলেন সুলতান সুলেমানের বোন। এই বিয়ের ফলে ইব্রাহিম পাশা পরবর্তীতে তুরস্কের একজন বনেদি পরিবারের সদস্য হয়ে যান। হাতুন স্বামীকে নিয়ে প্রথম দিকে যথেষ্ট সন্দিহান থাকলেও পরবর্তীতে তারা সুখী দাম্পত্যজীবন অতিবাহিত করেন। যদিও জনশ্রুতি আছে যে, ইব্রাহিম পাশা সুলতান সুলেমানের বোন হেটিজা সুলতানকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সত্য এই যে, এমন কোনো বিয়ের ঘটনা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। যাই হোক, আজও পাশার বাড়ি ইস্তাম্বুলের হিপোড্রোমের পশ্চিমে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যা বর্তমানে ‘টার্কিশ অ্যান্ড ইসলামিক আর্টস মিউজিয়াম’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কূটনৈতিক দিক দিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে ইব্রাহিমের সাফল্য অসাধারণ। ক্যাথলিক শাসকদের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তিতে তিনি সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এমনকি ভেনাসের কূটনৈতিকরাও তাকে ‘ইব্রাহিম দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট’ নামে ডাকতেন, যা ছিল সুলতান সুলেমানের উপাধি! ১৫৩৩ সালে তিনি রাজা চার্লস-৫ কে রাজি করান হাঙ্গেরিকে অটোমান সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত রাজ্য হিসেবে মেনে নিতে। ফ্রান্সের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গেও তিনি বিভিন্ন সমঝোতাপূর্ণ চুক্তি করতে সফল হন। সুলেমানের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র এবং ঘনিষ্ঠ ইব্রাহিম ১৫৩২ থেকে ১৫৫৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী অটোমান-সাফালিড যুদ্ধের এক পর্যায়ে সুলতানের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন। এর কারণ ছিল, তার নিজ কর্তৃক ‘সিরাসকার সুলতান’ উপাধি গ্রহণ। যা ছিল সুলেমানের জন্য রীতিমতো অপমানজনক। এছাড়া এই যুদ্ধ চলাকালীন অন্য একজন সেনাধিপতি ইস্কান্দার সেলেবি’র সঙ্গেও ইব্রাহিম পাশা নেতৃত্ব সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। ক্রমান্বয়ে এসব দ্বন্দ্বের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছালে ১৫৩৬ সালে সুলেমান তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। বেশ কিছু তথ্য মতে, ইব্রাহিম পাশা ছিলেন সুলেমানের স্ত্রী হুররাম সুলতানের ষড়যন্ত্রের শিকার। কারণ তিনি সুলেমানের পরে শাহজাদা মুস্তাফাকে সিংহাসনের দাবীদার হিসেবে সমর্থন দিয়েছিলেন। সুলতান সুলেমান পরবর্তীতে ইব্রাহিম পাশাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার জন্য স্ব-রচিত কবিতার মাধ্যমে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

 
 

[X]CLOSE

আরো খবর