বৃহস্পতিবার, ২৯ জুন ২০১৭, ১৫ আষাঢ় ১৪২৪, ৪ শাওয়াল, ১৪৩৮ | ০৭:১৪ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ ০৫:২৭:০৪ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

‘যমঘরে’ নির্মমতার সাক্ষী নবীগঞ্জের কল্পনা

 

‘আম্মাগো আম্মা, আমারে বাঁচাও। দুই দিনের ভেতরে দেশত না নিলে আমারে আর পাইতায় না। আমার লাশও পাইতায় না। সেকুল বেডারার লগে কণ্ট্রাক কইরা আমারে বিদেশ পাঠাইছুইন। সেকুল আমার সর্বনাশ করছুইন। আমারে বাঁচাও। আমি বাঁচতাম চাই। আমার লগে এমন আরো ১৯ জন বন্দি আছে দালালের অফিসে। আমারে দুই চার দিন বাদে বাদে একেক বাসায় পাঠাইন। আমারে মাইরা দইরা বেইজ্জত করইন।’ সুদূর সৌদি আরবের দাম্মাম থেকে নবীগঞ্জে মায়ের কাছে মেয়ে কল্পনার টেলিফোনে কথোপকথন এটি। এ টেলিফোন পেয়ে দিশাহারা পিতা-মাতা। কল্পনার ভাষায় এটি যমঘর। নির্যাতন আর নির্মমতায় তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মানুষরূপী আজরাইল দাঁড়িয়ে আছে জান কবজ করতে। বিদেশবিভুঁইয়ে এমন করুণ পরিস্থিতির শিকার কল্পনা। স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন সৌদি আরব। পরিবারে সচ্ছলতা আনতে নবীগঞ্জেরই দালাল সেকুলের মাধ্যমে হাসিমুখে সৌদি আরব যান তিনি। কে জানতো সেখানে গিয়ে তার হাসি পরিণত হবে কান্নায়। কল্পনার বেলায় সেটাই ঘটেছে। কিন্তু কল্পনার করুণ এ কাহিনী শুনে এগিয়ে আসেন হবিগঞ্জ-সিলেটের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী । খবর পেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী,  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পরিকল্পনা মন্ত্রী আ.হ.ম মোস্তফা কামাল, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম কল্পনাকে উদ্ধারে সচেষ্ট হন। তারা সৌদি আরবস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস, বাংলাদেশস্থ সৌদি দূতাবাস ও সিআইডিকে ঘটনার বিবরণ জানান। সিআইডির এডিশনাল ডিআইজি মো. শাহ আলম বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব নেন। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় নয়াপল্টনের গ্রীন বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে ট্র্যাভেল এজেন্সির এমডি জাকির হোসেন পাটোয়ারীকে। এরপরই গতকাল বিকালে সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় সিআইডি কল্পনাকে উদ্ধার করে। অবসান হয় শ্বাসরুদ্ধকর এক কাহিনীর। কিন্তু কিভাবে ঘটে এমন ঘটনা? হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থগ্রামে কল্পনার বাড়ি। তার পিতা এবাদ মিয়া। মাছ বিক্রি করে কোনো রকমে সংসার চালান। এবাদ মিয়ার দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। সবার বড় কল্পনা বিবি। বয়স ২৮ বছর। সংসারে সুখ আনতেই মেয়েকে পাঠান। আর বিদেশ গিয়ে ঘটে এমন বিপত্তি। মেয়ের ফোন পেয়ে এবাদ মিয়া নবীগঞ্জ থানায় মামলা করেন। এতে নবীগঞ্জ রাইয়াপুর গ্রামের দালাল সেকুল মিয়া ও গ্রীন বেঙ্গল ট্র্যাভেলসের এমডি জাকির হোসেন পাটোয়ারীকে আসামি করা হয়। ১৩ই ফেব্রুয়ারি দায়ের করা মামলায় এবাদ মিয়া ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করেন। বলেন, সেকুল মিয়া আমার পাশের ইউনিয়নের রাইয়ারপুর গ্রামের বাসিন্দা। সে বিভিন্ন দেশে অর্থের বিনিময়ে নারী-পুরুষ পাঠায়। আমাদের পাশের বাড়ির রাসনা বেগমসহ বেশ ক’জনকে সে বিদেশ পাঠিয়েছে। এবাদ মিয়া বলেন, আমাদের গ্রামে আসা-যাওয়ার সুবাধে সেকুল মিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়। এরই এক পর্যায়ে আমার মেয়ে কল্পনাকে গ্রীন বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে সৌদি আরব পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। সেকুল জানায়, ৫০ হাজার টাকা দিলে সে আমার মেয়েকে সৌদি আরব পাঠাবে। সেখানে এক সৌদিয়ানের বাড়িতে রান্নার কাজ করতে হবে। বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। আমি সেকুলের কথা বিশ্বাস করে স্বজনদের কাছ থেকে ধারকর্জ করে গত বছর ১২ই জুন ৫০ হাজার টাকা ও কল্পনার ছবি দেই। কল্পনার পাসপোর্ট নং- Bl 0348315। এরপর সেকুল ঢাকায় নিয়ে যায় কল্পনাকে। সেখানে প্রায় একমাস রেখে বিদেশে কাজের ট্রেনিং দেয়। পরে ৫ই ডিসেম্বর সকালে আমার বাড়ি এসে কল্পনা বিবি ও সোহেনা বেগমকে ঢাকায় নিয়ে যায়। ৬ই ডিসেম্বর রাত ১টায় কল্পনা সৌদি আরবের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। এর বেশ ক’দিন পর এক সন্ধ্যায় কল্পনা আমার অপর মেয়ে সোহেনা বেগমের মোবাইলফোনে কথা বলে। এসময় তার মা ও আমার সঙ্গেও কথা হয় কল্পনার। ফোনে কল্পনা জানায়, সৌদি আরব যাওয়ার পর তার কফিল তাকে একেক দিন একেক বাড়িতে দিয়ে দেয়। এছাড়া, অন্যান্য দিন একটি কক্ষে আটক করে রাখে। যেখানে তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। কথায় কথায় মারধর, কিল, ঘুষি, লাথি নিত্যদিনের চিত্র। ওই কক্ষে তার সঙ্গে আরো ১৯ থেকে ২০ জন রয়েছে বলেও সে জানায়। যাদের বেশির ভাগের বাড়ি সিলেটের বিভিন্ন জেলায়। এরপর থেকে কল্পনার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হচ্ছে না বলে জানান এবাদ মিয়া। কল্পনার ফোন: আম্মা, আম্মাগো আমারে বাঁচাও। সেকুল আমারে দালালের কাছে বেঁচে দিয়েছে। দাম্মামে একটি ঘরে আমাদের আটকে রাখা হয়। এছাড়া একেক দিন একেক বাড়িতে পাঠানো হয়। আম্মা আমারে যদি জীবিত দেখতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি আমারে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো। ওরা আমাকে মেরে-ধরে শেষ করে দিচ্ছে। বেইজ্জত করছে। এখন যে বাড়িতে আছি ওই বাড়ির মহিলারে বলে তোমাদের কাছে ফোন করছি। আর হয়তো ফোন করতে পারবো না। দ্রুত আমাকে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো। কল্পনা বলেন, আম্মাগো ওরা জানোয়ার। এরপর তার বাবার সঙ্গে কথা বলেন, ‘আব্বা আমাকে বাঁচাইবানি। আব্বা আমারে বাঁচাইলে সেকুলের বাড়ি যাও। ওরে বলো আমারে ফিরাইয়া আনতে। দুইদিনের মধ্যে যদি আমাকে দেশে না নিতে পারো তাহলে আমারে আর খুঁজে পাবে না। সেকুল কণ্ট্রাক করে আমাদের বিদেশ পাঠাইছে। আমাদের বিভিন্ন বাড়িতে পাঠায় আর টাকা নেয় কফিল। আমাকে দেশে না নিলে ফাঁস দিয়ে মরবো। একেক বাড়ি থেকে নিয়ে আমাদের রাখে ওদের অফিসে। ওটা একটা যমঘর। খাওন দেয় না। একটা রুটি ঢিল মারে। ওইটা খাইয়া থাকতে হয়। তোমরা যদি আমারে দেখতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো।’ টানা ৩১ মিনিটের ওই টেলিফোন কথাবার্তায় বেশির ভাগ সময়ই কল্পনা হাউ মাউ করে কেঁদেছেন। আর তাকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছেন। এমপি কেয়া চৌধুরী যা বললেন: হবিগঞ্জ-সিলেটের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী বলেছেন, গত সোমবার রাতে পাগলের মতো কল্পনার মা-বাবা আমার বাসায় ছুটে আসেন। রাত তখন সাড়ে ১১টা হবে। দেখি তারা হাউমাউ করে কাঁদছেন। তারা ঘটনা বিস্তারিত জানান। আমি সঙ্গে সঙ্গে হবিগঞ্জের এসপি জয়দেব ভদ্রকে ফোন করি। তার কাছে সহযোগিতা চাই। তিনি আমাকে জানান, যেহেতু এটা বিদেশের ব্যাপার সেহেতু এটা উপরের সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে তিনি সিআইডির ডিআইজি শাহ আলমের ফোন নাম্বার দিয়ে উনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। বিষয়টি আমি শাহ আলমকে জানাই। তার পরামর্শে মামলা করাই। এরপর আমি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করি। জানতে পারি তিনি দেশে নেই। তারপরও প্রতিমন্ত্রীর কাছে মামলার কাগজপত্র ও কল্পনার রেকর্ডকৃত কথা ম্যাসেঞ্জারের মেসেজে পাঠাই। মঙ্গলবারই সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে দেখা করি। উনাকে বিষয়টি জানাই। তিনি আমাকে লিখিতভাবে জানাতে বলেন। মন্ত্রীর কাছেও আমার প্যাডে লিখিতভাবে বিস্তারিত জানাই। তিনি সেদিনই সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। সংসদে পরিকল্পনা মন্ত্রী আ.হ.ম মোস্তফা কামালও বিষয়টি শুনে আমার কাছে লিখিত চান। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হন। বুধবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আমাকে ফোন করেন। বিস্তারিত কথা হয় তার সঙ্গে। ওদিকে সিআইডির ডিআইজি শাহ আলমও আমাকে ফোন করে আসামিদের গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এরই প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সকালে নয়াপল্টনের গ্রীন বেঙ্গল ট্র্যাভেল এজেন্সিতে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে জাকিরকে গ্রেপ্তার ও আয়েশা নামের আরেক মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। এমপি কেয়া চৌধুরী বলেন, আমি বৃহস্পতিবার সংসদে এ নিয়ে কথা বলেছি। কেউ যেন না জেনেশুনে কোনো মেয়েকে বিদেশ না পাঠায় এ আহ্বান রেখেছি। তিনি বলেন, খুব দ্রুত কল্পনাকে উদ্ধার করতে পারা সরকারের বিরাট একটা সফলতা। অসহায় পরিবারটি আজ তার সন্তানকে ফিরে পাবে। সৌদি আরব থেকে রাতেই ঢাকায় পৌঁছবে বলে আশা করছি। সকালে কল্পনাকে নিয়ে হবিগঞ্জ আদালতে তোলা হবে। এরপর তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করবো। এ ব্যাপারে সিআইডি’র এডিশনাল ডিআইজি শাহ আলম বলেন, কিছু কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি গৃহকর্মী হিসেবে নারীদের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পাঠায়। নিয়ম অনুযায়ী ২৫ বছরের বেশি বয়সী নারীদের পাঠানোর কথা থাকলেও তারা এর চেয়ে কম বয়সী নারীকর্মী পাঠাচ্ছে। কল্পনার বিষয়টি এমনই একটি ঘটনা। সে সেখানে নানা হয়রানির শিকার হয়েছে। দেশে এলে তার সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানা যাবে। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এজেন্সির এমডিকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। কল্পনা তাদের মাধ্যমে দেশের বাইরে গিয়েছে এর প্রমাণও পেয়েছি। এছাড়া ওই এজেন্সি থেকে আরও একটি মেয়েকে উদ্ধার করেছি। তার বয়স মাত্র ১৫ থেকে ১৬ বছর হবে। অথচ তার পাসপোর্ট করা হয়েছে। মেডিকেল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এই মেডিকেল প্রক্রিয়াটা কিভাবে সম্ভব হলো, কিভাবে সে ফিট হলো সেটিও আমরা খতিয়ে দেখছি। তিনি বলেন, দূতাবাসের জিম্মায় কল্পনা রয়েছে। দেশে এলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে অন্যান্য তথ্য জানতে পারব।

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর