মঙ্গলবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, ৯ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৪ জমাদিউল আওয়াল, ১৪৩৮ | ০৯:৪২ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০১৫ ১০:০৫:৫৫ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

বাংলা সাহিত্যে পাঠকপ্রিয় ১০ গোয়েন্দা চরিত্র

একেবারে টলস্টয়-এর স্টাইলে বর্ণনা করলে ব্যোমকেশের চেহারা দাঁড়ায়- ধারালো নাক, লম্বা গড়ন, একটু স্থূল মুখমণ্ডল। যাবতীয় জটিল রহস্যের জাল একটার পর একটা খুলে ফেলে সে বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল ও শুভ বুদ্ধির দ্বারা। ব্যোমকেশের আছে এক আশ্চর্য বিশ্লেষণী দক্ষতা। সে কথা বলে কম। চেহারাটা বাইরে থেকে এমন করে রাখে যেন সহজে কেউ তার ভেতরটা পড়ে ফেলতে না পারে। ব্যোমকেশের সহযোগী বন্ধু অজিত। ব্যোমকেশ পুলিশের চাকরি না করেই সত্যের অনুসন্ধানে নিজেকে সর্বদা সচেষ্ট রাখে। একটি খুনের মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পরিচয় ঘটে কৃষ্ণকলি সত্যবতীর সঙ্গে। সেই পরিচয় পরিণয়ে রূপ নিতে বেশি সময় লাগেনি। বাংলা সাহিত্যের এই অনবদ্য গোয়েন্দা চরিত্রটির স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্যোমকেশ বকশীকে নিয়ে তার কাহিনি মোট ৩৩টি। ১৯৩২ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত তিনি এই কাহিনিগুলো লিখেছেন। ব্যোমকেশকে নিয়ে লেখকের প্রথম বই ‘সত্যান্বেষী’। আজ আর শুধু বইয়ের পাতায় বন্দি নেই ব্যোমকেশ। তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে টিভি সিরিজ, সিনেমা ও রেডিও অনুষ্ঠান।

 

ফেলুদা : বাংলা সাহিত্যে সত্যজিৎ রায়ের কিংবদন্তি গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা। পুরো নাম প্রদোষচন্দ্র মিত্র। ১৯৬৫ সালে ডিসেম্বর মাসে ফেলুদার প্রথম গল্প ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’যখন প্রকাশিত হয় তখন রীতিমত চারিদিকে হই চই পড়ে যায়। ২১ রজনী সেন রোডে ফেলুদার বাস। ফেলুদা শার্লক হোমসের ফ্যান। রহস্য সমাধানে তিনি শারীরিক শক্তি কিংবা অস্ত্রের ব্যবহার করেন না। পর্যবেক্ষণ ও অসম্ভব বিশ্লেষণী ক্ষমতার মাধ্যমে তিনি একের পর এক রহস্যের জট খোলেন। জটায়ু নামে রহস্য উপন্যাস লেখেন ফেলুদার বন্ধু জনপ্রিয় লেখক লালমোহন বাবু। ফেলুদার সব অভিযান খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখে তপেশরঞ্জন মিত্র। ডাকনাম তোপসে। জনপ্রিয় এই গোয়েন্দা কাহিনিতে আমরা দেখা পাই সিধু জ্যাঠা, মগনলাল ও মেঘরাজের। ফেলুদার কাহিনি নিয়ে সিনেমা, টিভি সিরিজ, টেলিফিল্ম- এক কথায় সবই নির্মিত হয়েছে। ও হ্যাঁ, ফেলুদার ট্রেডমার্ক হল, চারমিনার সিগারেট।

 

কাকাবাবু : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি রাজারায় চৌধুরী। যাকে সবাই ‘কাকাবাবু’ বলে চেনে। কাকাবাবু সরকারি চাকরি করেন। তার একটা পা ভাঙা, ক্রাচে ভর দিয়ে অতি কৌশলে হাঁটেন। এক পা খোঁড়া বলে লেখক বোধহয় ইচ্ছা করেই তার দুই হাতে অনেক জোর দিয়েছেন। কাকাবাবু অবিবাহিত। রহস্যের খোঁজ যেখানেই পান মুহূর্তে সেখানেই ছোটেন তিনি। তার অভিযানে সব সময়ের সঙ্গী সন্তু ওরফে সুনন্দ। মাঝে মাঝে সন্তুর বন্ধু জোজোও তাদের সঙ্গ নেয়। জোজো আবার স্বভাবে চাপাবাজ টাইপের। অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে প্রায়ই দেখা পাওয়া যায় দেবলীনা দত্ত, শৈবাল দত্ত, রিনি ও নরেন্দ্র ভার্মাকে। ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ নামে আনন্দমেলা পত্রিকায় ১৯৭৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় কাকাবাবুর কাহিনি। ২০১২ সাল অর্থাৎ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সুনীল বাবু মোট ৩৬টি কাকাবাবুর কাহিনি লিখে গেছেন।

 

তিন গোয়েন্দা : রবার্ট আর্থারের ‘থ্রি ইনভেস্টিগেটরস’র ছায়া অবলম্বনে তিন গোয়েন্দা লেখা হয়। ১৯৮৫ সালের আগস্টে তিন গোয়েন্দা বের হওয়ার পর এতো জনপ্রিয় হয় যে, তিন গোয়েন্দার লেখক রকিব হাসান একটানা ১৬০টি বই লেখেন। পরবর্তীতে শামসুদ্দিন নওয়াবও তিন গোয়েন্দা সিরিজের কিছু বই লেখেন। তিন গোয়েন্দা হলো কিশোর পাশা, রবিন মিলফোর্ড ও মুসা আমান। তাদের বাস প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলসের রকি বীচে। একমাত্র বাঙালি কিশোর পাশা। ছোটবেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা মাকে হারায়। বড় হয় চাচী মেরি ও চাচা রাশেদ পাশার কাছে। বই পাগল আমেরিকান রবিন মিলফোর্ড। দলের পেশীশক্তিওয়ালা মুসা আমান আমেরিকান-আফ্রিকান। স্যালভেজ ইয়ার্ডে পুরনো এক মোবাইল হোমে তাদের হেডকোয়ার্টার। এখান থেকেই তাদের সকল অপারেশন পরিচালিত হয়। তিন গোয়েন্দা পড়তে পড়তে আমরা একে একে পরিচিত হতে থাকি- ওমর শেরিফ, ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার, রাঁধুনি নিসানজা কিম, গোয়েন্দা ভিক্টর সাইমন, হলিউড মুভি পরিচালক ডেভিড ক্রিস্টোফার, চিরশত্রু শুঁটকি টেরি, কুকুর রাফি ও জর্জিনা পার্কারের সঙ্গে।    

 

টেনিদা : ‘ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক’ সংলাপের মাধ্যমে সহজেই পাঠক হৃদয় দখল করে আছেন যিনি তিনি আমাদের টেনিদা ওরফে ভজহরি মুখার্জি। টেনিদা থাকেন কলকাতার পটলডাঙায়। তার মুখের গল্প শুনতে অনেকে ভিড় করে। তুখোড় গল্প বলিয়ে তিনি। ফুটবল মাঠে যেমন সেরা তিনি। আবার ক্রিকেট খেলার ক্যাপ্টেন। কেউ বিপদে পড়েছে সেখানে টেনিদা নেই- এটা হতে পারে না। তার পর্বতের মতো খাড়া নাক দেখে চমকে যায় পাঠক। মোট চারজনের টিম টেনিদার। এই চারজনকে নিয়েই তিনি বিভিন্ন অভিযানে বের হন। প্রত্যেক রহস্যের সমাধান না করা পর্যন্ত তাদের অভিযান থামে না। টেনিদার সঙ্গী প্যালারমতার সব কাহিনির বর্ণনাকারী। হাবুল সেন কথা বলে ঢাকাইয়া ভাষায়। টিমের মধ্যে সবচেয়ে চালাক ক্যাবলা। টেনিদাকে নিয়ে লেখা হয়েছে মোট ৫টি উপন্যাস, ৩২টি গল্প আর ১টি নাটিকা। এ ছাড়াও তৈরি হয়েছে কমিকস, মুভি ও অ্যানিমেটেড সিরিজ। বাংলা সাহিত্যের এই জনপ্রিয় চরিত্রটির কারিগর নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।

 

ঘনাদা : প্রেমেন্দ্র মিত্র এর ‘মশা’ গল্পে প্রথম ঘনাদা ওরফে ঘনশ্যাম দাসের দেখা পাই। সেটা ১৯৪৫ সালের কথা। ঘনাদাকে নিয়ে ১৯৪৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মোট পনেরোটি বই প্রকাশিত হয়। ঘনাদা ৭২ নং বনমালী লস্কর লেনে একটি মেসে থাকেন। মেসের প্রতিবেশী শিবু, শিশির, গৌর আর সুধীর এই চার যুবককে নিয়েই তার সব কাহিনি। ঘনাদা নিজের জীবনের নানা অভিযান সম্পর্কে আজগুবি ও অবিশ্বাস্য গল্প মুখে মুখে বানিয়ে শোনান। তবে বানানো গল্পের ভেতর বাস্তবের শক্ত ভীত থাকে। ঘনাদার গল্পগুলিতে তিনি নিজেই নায়ক। সবাই বিশ্বাস করে ঘনাদা বুদ্ধিতে তুলনাহীন। ঘনাদার আরেকটা পরিচয় তিনি খুব ভোজনরসিক। ঘনাদার গল্পে আমরা আরও দেখা পাই রাঁধুনি রামভুজ, বানোয়াড়ি, বাপী দত্ত, সুশীল চাকীর। ঘনাদার অধিকাংশ গল্প জুড়ে থাকে রোমাঞ্চ-ইতিহাস-ঐতিহ্য-বিজ্ঞান ও কল্পকাহিনি।

 

প্রফেসর শঙ্কু : সালটা ১৯৬১। সন্দেশ পত্রিকায় বের হলো ‘ ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি’। সেখানে দেখা মেলে স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যাপক প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর। তিনি একজন পদার্থ বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারক। অকুতোভয়, আত্মভোলা শঙ্কু ৬৯টি ভাষা জানেন। বিহারের গিরিডিতে তার কাজের ক্ষেত্র। অবিবাহিত বিজ্ঞানী হিসেবে তার খ্যাতি জগতজোড়া। শঙ্কুর আবিষ্কারের ঝুঁড়িতে আছে ৭২টি আবিষ্কার। তারমধ্যে কয়েকটি হলো, ম্যাঙ্গোরেঞ্জ, অ্যানাইহিলিন, নার্ভিগার, মিরাকিউরল, অমনিস্কোপ, ক্যামেরাপিড। পোষা বিড়াল নিউটন ও চাকর প্রহ্লাদকে নিয়েই তার কাজ কারবার। কখনো কখনো প্রতিবেশী অবিনাশ চট্টোপাধ্যায় ও শুভাকাঙ্ক্ষী নকুড় বাবুকেও আমরা দেখতে পাই। মঙ্গলগ্রহ থেকে শুরু করে ইংল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, স্পেন এমনকি সাহারা মরুভূমি ও সমুদ্রের তলদেশেও তিনি অভিযান চালান। প্রফেসর শঙ্কু চরিত্রের অমর স্রষ্টা সত্যজিৎ রায় ১৯৬১ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত শঙ্কুকে নিয়ে মোট ৩৮টি সম্পূর্ণ ও ২টি অসম্পূর্ণ কাহিনি লিখেছেন।

 

কুয়াশা : কাজী মোতাহার হোসেনের সুযোগ্য পুত্র কাজী আনোয়ার হোসেনের সৃষ্ট চরিত্র কুয়াশা। এই সিরিজের প্রথম বই ‘কুয়াশা-১’ নামে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে। কুয়াশা পেশায় একজন বিজ্ঞানী। নিজেকে উৎসর্গ করেছেন বিজ্ঞানের সাধনায়। জন্মস্থান কুষ্টিয়া। জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল স্যান্ডেনবার্গের সঙ্গে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি বাংলাদেশ ছাড়েন। পুনরায় দেশে ফেরেন ঠিক ১৫ বছর পর। দেশে ফিরে তিনি গোপনে গবেষণার কাজ করেন। মানুষের কল্যাণের জন্য গবেষণা করেন তিনি। কাজের জন্য প্রচুর টাকা দরকার পড়লে অবৈধ পথ বেছে নিতেও  দ্বিধা করেন না। আইনের চোখে তিনি একজন ফেরারি আসামি। তার একমাত্র বোনের নাম মহুয়া। কুয়াশা সিরিজের বইয়ের মধ্যে আমরা আরও যেসব চরিত্রের সন্ধান পাই তাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন হলো, কামাল, ডি কস্টা, গফুর, মি সিম্পসন,লিনা রাসেল, ড. ওয়াই ও শখের গোয়েন্দা শহীদ। তবে দুঃখের খবর হলো, কুয়াশা সিরিজের প্রকাশনা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

 

মাসুদ রানা : তরুণ মাসুদ রানা বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স-এর এজেন্ট। সাংকেতিক নাম এম আর নাইন। তার পেশা গুপ্তচর বৃত্তি। বিশ্বখ্যাত ইয়ান ফ্লেমিং-এর গোয়েন্দা সিরিজ জেমস বন্ডের ছায়া অবলম্বনে তৈরি মাসুদ রানা। মাসুদ রানার পরিচালিত সংস্থার নাম ‘রানা এজেন্সি’। তার বাবা জাস্টিস ইমতিয়াজ চৌধুরী। মাসুদ রানা পৃথিবী ও বন্ধু বান্ধবদের বিভিন্ন বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মিশনে নামে। এই চরিত্রের স্রষ্টা আনোয়ার হোসেন মাসুদ রানা সম্পর্কে বলেন, ‘সে টানে সবাইকে কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।’ মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই বের হয় ধ্বংস পাহাড় নামে ১৯৬৬ সালে। এখন পর্যন্ত চার শতাধিকেরও বেশি বই লেখা হয়েছে মাসুদ রানাকে নিয়ে। মেজর জেনারেল রাহাত খান, সোহেল, বিজ্ঞানী কবির চৌধুরী, গিলটি মিয়া, সোহানা, রূপা এই চরিত্রগুলোই মাসুদ রানা সিরিজের প্রাণ।

 

ঋজুদা : ঋজুদার স্রষ্টা বুদ্ধদেব গুহ নিজেই ঋজুদা সম্পর্কে বলেন, ‘পূর্ব আফ্রিকা থেকে ভারত মহাসাগরের সেশ্যেলস আইল্যান্ড, মণিপুর, মিয়ানমার বা আন্দামান আইল্যান্ড বা ভারতের নানা প্রান্তের সব বনভূমিতে আমি নিজে ঘুরে আসার পরই ঋজুদা কাহিনি লিখতে বসেছি তোমাদের জন্যে। তাই এগুলি শুধুমাত্র গোয়েন্দা বা শিকার কাহিনি নয়, এগুলো পড়লেও বাড়িসুদ্ধ সকলের নতুন নতুন নানা জায়গায় বেড়িয়ে আসার সুযোগ হবে এই সব লেখার মাধ্যমে।’ ঋজুদার প্রথম বই ‘ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে’। ঋজুদার কাহিনিতে আমরা দেখি সঙ্গী রুদ্রকে নিয়ে সে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। রহস্যের সঙ্গে সঙ্গে অনেক শিকারের গল্পও আমরা পাই এই সিরিজে। ঋজুদার আরো দুই সঙ্গী তিতির ও ভটকাই।

 

আরো খবর