রোববার, ২০ আগস্ট ২০১৭, ৫ ভাদ্র ১৪২৪, ২৭ জিলকদ, ১৪৩৮ | ০২:১১ পূর্বাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
শুক্রবার, ১৯ মে ২০১৭ ০৪:৩৭:৩৩ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

দেশে ধর্ষণ মামলার বিচার হচ্ছে কতটা?

দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের বহু ঘটনা ঘটছে কিন্তু তার বিচার এবং শাস্তি হচ্ছে খুবই কম। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়। এছাড়া ধর্ষণের বিচার পেতেও নারীকে পদে পদে হয়রানি আর অবমাননার শিকার হতে হয়। ধর্ষিত হয়ে চার বছর মামলা চালিয়ে বিচার পেয়েছেন এমন একটি মেয়ে বিবিসিকে বলেন, মাদ্রাসার একজন শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষিত হয়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিলেন। নাম পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এ ভিকটিম বলেন, ‘আমার টিচার ছিল। ঘটনা হওয়ার পর আমরা পুলিশের কাছে যাই নাই। অনেক পরে জানাজানি হইছে। আমার ফ্যামিলিও জানতো না। আমারে ভয় দেখানো হইছিল। আর আমি তখন কিছুই বুঝতাম না। জানার পরে আমার আব্বু কোর্টে মামলা করে। মেডিকেল রিপোর্টে আসছিল আমি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছিলাম। আমার ঘটনা জানাজানির পরেই নিরাপত্তার জন্য আমি মহিলা আইনজীবী সমিতির শেল্টারে ছিলাম।’ ধর্ষণের শিকার নারীকেই দোষী করার একটা প্রবণতা এদেশের সমাজে আছে সেটিও এ ভিকটিমের অভিজ্ঞতা হয়েছে। তিনি আরো বলেন ‘আমার এলাকার মানুষও সবসময় আমার বিরুদ্ধে ছিল। তারা চাইছিল আমাদের এলাকা থেকে বের করে দেয়ার।’ ধর্ষণের শিকার নারীকে বার বার ঘটনার বিবরণ দেয়া এবং নানান প্রশ্নের মুখে বিব্রত হতে হয়। এ ভিকটিম বলছিলেন,’আমি কোর্টে দুইবার গেছি। আমি মিথ্যা বলতেছি এমন প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। একটা সত্য ঘটনা মিথ্যা বলে প্রমাণের চেষ্টা করলে খারাপ লাগবেই। কোর্টের মাঝখানে এত মানুষের সামনে কথা বলতে আমার খুউব আনইজি লাগছে। এতগুলা মানুষের সামনে এত পারসোনাল বিষয়ে এতকথা বলা! তারপর এক একজন এক এক কথা বলে একেকটা মন্তব্য করে। যেমন এটা মিথ্যা হইতে পারে বা আমি খারাপ।’ চার বছর মামলা চলার পর তার ধর্ষকের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। এই ভিকটিম চার বছরে বিচার পেলেও অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সারাদেশে ৮টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে কাউন্সেলিং, পুলিশি ও আইনি সহায়তা দেয়া হয়। ২০০১ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত এসব কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৩শ ৪১টি যৌন নির্যাতনের মামলা হয়েছে যার মধ্যে ৫শ ৭৮টি বিচার হয়েছে এবং সাজা হয়েছে মাত্র ৬৪টি ঘটনার। ঢাকা মেডিকেলের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কো-অর্ডিনেটর ডাক্তার বিলকিস বেগম বলেন, শারীরিক পরীক্ষা যথাসময়ে না হলে ধর্ষণ প্রমাণ ও বিচার পাওয়া কঠিন। তিনি বলেন, ‘আইনি লড়াইয়ের জন্য এই যে সার্টিফিকেটটা খুবই দরকার। এই সার্টিফিকেট না হলে কোনো বিচারই হবে না। ওরা আসতেই দেরি করে ফেলে অনেক সময়। ফাইন্ডিংস আমরা ঠিকমতো পাইনা। ঘটনা ওরা স্থানীয়ভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে, সময়টা কিল করে ফেলে। লিডাররা বসে সাতদিন পনেরদিন পার করে ফেলে আমরা ফাইন্ডিংস পাই না।’ বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ধর্ষণের মামলায় আইনি সহায়তা দেয়। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন,‘বিচারহীনতার কারণেই কিন্তু ধর্ষণের বিষয়গুলা আরো বেশি হচ্ছে। বার বার প্রমাণ করতে গিয়ে ভিকটিম দ্বিতীয় বার ধর্ষণের শিকার হয়। থানায় মামলা নিতে বা আসামী পক্ষের আইনজীবী যেভাবে প্রশ্ন করে তখন কিন্তু সে আরেকবার ধর্ষণের শিকার হয়। আইনে আছে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে, বিশেষ ক্ষেত্রে কারণ দেখিয়ে কিছুটা সময় নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মামলা শেষ হতে দশ বছর বিশ বছরও লেগে যাচ্ছে।’ ধর্ষণের বিচারহীনতার কারণ হিসেবে ভিকটিম এবং নারী অধিকার কর্মীরা পুলিশের গাফিলতির প্রসঙ্গটি বারবারই সামনে আনে। থানায় মামলা দায়ের থেকে শুরু করে ভিকটিমের সঙ্গে আচরণ, তদন্ত এবং অপরাধীকে গ্রেপ্তার সবক্ষেত্রেই অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে পুলিশে অতিরিক্ত মহা পরিদর্শক মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘কখনো কখনো আমাদের যারা ফিল্ডে কাজ করেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অথবা সাব ইন্সপেক্টর যারা আছেন তাদের মনে যদি কখনো সন্দেহের উদ্রেগ হয় সেই সময় তারা তাৎক্ষণিক-ভাবে কাল বিলম্ব না করে কিছুটা ভেরিফাই করার চেষ্টা করেন।’ তদন্ত ও বিচার বিলম্বের কারণ হিসেবে রহমান বলেন,’যিনি ভিকটিম বা ভিকটিমের পরিবার তার সঙ্গীরা সেখান থেকে যদি যথাযথভাবে সহযোগিতা না করে এবং একটা পর্যায়ে গিয়ে যদি সাক্ষী যদি না আসে একটা আপসরফা করে ফেলে সেইক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের শেষ পর্যন্ত কিছু করার থাকে না। সেক্ষেত্রে কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি করা সম্ভব না। আমরা চার্জশিট দেয়ার পরেও যদি বিজ্ঞ আদালতে গিয়ে সাক্ষীরা না দাঁড়ায় না কথা বলে সেক্ষেত্রেও কিন্তু মামলা ঝুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’ বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যে জানা যায় ২০১৬ সাল এবং ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ হাজার ৮শর বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। দেশে ধষর্ণের মামলায় বিচারের হার নিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখছি ধর্ষণ মামলায় মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের শেষ পর্যন্ত সাজা হয়। প্রত্যেকটা জায়গায় একজন মহিলাকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে অথবা একটা কিশোরীকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে যে সে ধর্ষিত হয়েছে। যেটা আমরা চাই আসামীই প্রমাণ করবে যে সে নির্দোষ। রেপ কেসে এইটাই কিন্তু হওয়া উচিৎ।’

CLOSE[X]CLOSE

আরো খবর