বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭, ১৬ চৈত্র ১৪২৩, ২ রজব, ১৪৩৮ | ০৮:৩৩ অপরাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
সোমবার, ২৮ মার্চ ২০১৬ ০৮:৫৯:১৫ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

কেন তবে আত্মহনন?

   


 নেফারতিতি চৌধুরী : শ্রাবনীর ছোট মামা মারা গেছেন। যখন খবরটা পেলাম হতভম্ব হয়ে গেলাম। শ্রাবণী (ছদ্মনাম) জানালো তার ছোট মামা অফিসে ছিলেন। এক সহকর্মী তার রুমে গিয়ে দেখতে পান তিনি চেয়ারে মৃত পড়ে আছেন।

ছোট মামার বয়স কম। মাত্র ২৯ বছর। ডাক্তার বলেছেন, হাই ডোজ ড্রাগ গ্রহণের ফল এটা। সবচেয়ে কষ্টদায়ক ব্যাপার হচ্ছে যে, তার টেবিলের ড্রয়ারে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ পাওয়া গেছে। ওষুধগুলো সব স্নায়ু শীতল রাখার আর ঘুমের।

 

শ্রাবনী জানালো, ছোট মামা ড্রাগ নিচ্ছিলেন প্রায় তিনমাস ধরে- এটা তারা জানতো। কিন্তু তিনি যে প্রতিদিনই উচ্চ মাত্রার ঘুমের ওষুধ নিচ্ছিলেন তারা কেউ তা ভাবেনি।

 

আমি জানতে চেয়েছিলাম, কেন মামা এভাবে ড্রাগ নিচ্ছিলেন?

 

শ্রাবণী বলল, একটা মেয়ের সাথে মামার  সম্পর্ক ছিল। প্রায় তিন বছর সম্পর্ক রাখার পর হুট করে মেয়েটি তিন মাস আগে মামাকে না জানিয়ে অন্য ছেলেকে বিয়ে করেছে। এরপর থেকে মামার এই অবস্থা।

 

কিছুদিন আগে আমি একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে একটা ছেলেকে দেখলাম। খুব পেটানো শরীর, বেশ চোখে পড়ে। সে যে নিয়মিত জিমনেশিয়ামে যায় সেটা স্পষ্ট। কিছুক্ষণ পর জানতে পারলাম এই ছেলেটা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সময়মত তার মা উপস্থিত হওয়ায় তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। অথচ ছেলেটি তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ছেলেটিকে ছেড়ে তার গার্লফ্রেন্ড চলে গেছে, তাই সে আত্মহননের চেষ্টা করেছিলো।

 

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনার অবতারণা করছি এখন। যার কথা বলব, সে পড়ত ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে।  ছেলেটি গ্রাম থেকে এসে ঢাকায় একটি কলেজে ভর্তি হয়েছিলো, থাকতো মেসে। ছেলেটি ফেসবুক ব্যবহার করত আর সেখানেই শুরু। পরিচয় হল একজনের সাথে। এরপর দুজনের দিন রাত চ্যাটিং। 

 

একদিন দেখা হল দু’জনের। ঘোরাঘুরি চলল। কয়েকদিন যেতে না যেতেই মেয়েটি এড়াতে শুরু করলো ছেলেটিকে এবং জানালো তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলেটি যেন তাকে উৎপাত না করে- সে কথাও জানিয়ে দিলো। কয়েকটা দিন পর ছেলেটি তার ফেসবুক আইডিতে একটা স্ট্যাটাস দিলো- বন্ধুরা চলে যাচ্ছি, আর কখনো কথা হবে না। স্ট্যাটাস দেয়ার কিছুক্ষণ পর সে আত্মহনন করলো।

 

উপরে যে তিনটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে তা সত্য। এখন প্রশ্ন হল, আত্মহনন কেন ?

 

প্রতিটি ধর্মে আত্মহত্যাকে সৃষ্টিকর্তার ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছে। তারপরও কেন এই আত্মহনন! যে মানুষগুলো আত্মহত্যা করে, আসলেই কি তারা এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অযোগ্য ? একটি প্রশ্ন মনে রাখা দরকার যে, এই জীবনকে কেন নিজেই হত্যা করবো? 
জীবনে প্রেম, ব্যর্থতা, ঘাত প্রতিঘাত, দুঃখ কষ্ট আসতেই পারে। প্রেম এসে চলেও যেতে পারে। প্রেম চলে গেলে অনেক কষ্ট হবে, মরে যেতে ইচ্ছে করবে, তাই বলে মরে যেতে হবে? একবারও কি ভাবনায় আসবে না যে, মা আমাদের জন্ম দিয়েছেন, তার কি হবে? যে বাবা এত কষ্ট করে বড় করেছেন তার কি হবে? আর ভাই ও বোনগুলো কাকে ভাইয়া বা আপু বলে ডাকবে? কীভাবে হওয়া যায় এতটা স্বার্থপর! প্রেম জীবনেরই একটা অংশ। তাই বলে মরে প্রমাণ করতে হবে যে, প্রেমের মানুষটি ছিলো ভীষন ভালোবাসার!

 

জন্ম দিলেন একজন, লালন পালন করে বড় করলেন আরেকজন অথচ আত্মহনন করে জীবনটা দেয়া হলো অকালে। জীবনের একটা অধ্যায়ে একজন প্রভাব ফেলে চলে গেছে, তাই বলে নিজের মূল্যবান জীবনটাকে ঠুনকো ভাবা হচ্ছে। কিন্তু কেন?

 

আত্মহত্যার চেষ্টা না করে বরং যিনি চলে গেছেন তাকে দেখিয়ে দেয়া যেতে পারে যে, তাকে ছাড়াও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা যায়। দেখিয়ে দেয়া যায়, তাকে ছাড়াই অনেক ভাল থাকা যায়, সুখে থাকা যায়। এতে নিজের মূল্যবোধেরই জয় হয়।

 

মনের মানুষ যদি চলেই যায় তো কিছুদিন অনেক খারাপ লাগবে, অনেক কষ্ট হবে, মরে যেতে ইচ্ছে করবে। সেই সময়টাতে বেশি করে বন্ধু-বান্ধবের কাছাকাছি থাকা যেতে পারে। পরিবারের মানুষগুলোর সাথে সময় কাটানো যেতে পারে। যখনই খারাপ লাগবে বাইরে বেরিয়ে ঘোরাঘুরি করা যেতে পারে।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপার, সেটা হচ্ছে এই সময় মানুষের হৃদয়ে শূন্যস্থান থাকে। সেই স্থান থাকে খুব নাজুক অবস্থায়। ফলে নতুন কেউ কড়া নাড়লেই মানুষ সহজেই সাড়া দিয়ে ফেলে। কিন্তু ভুলেও এই কাজ করা ঠিক হবে না। নাজুক অবস্থায় আবার একটি ধাক্কা খাওয়ার ঝুঁকি নেয়া মোটেও উচিত হবে না। সবকিছু আবেগ দিয়ে বিচার না করে বিবেকটাকেও কাজে লাগাতে হবে।

 

জীবনের কোন সময়ে যদি এ ধরনের আত্মঘাতী চিন্তার উদ্রেক হয় তবে অবশ্যই একবার হলেও মায়ের মুখখানা দেখার চেষ্টা করা উচিত। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, জীবন আছে তো সুন্দর পৃথিবী আছে। 

[X]CLOSE

আরো খবর