রোববার, ২২ অক্টোবর ২০১৭, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর, ১৪৩৯ | ১০:৫১ অপরাহ্ন (GMT)
শিরোনাম :
  • নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে আ.লীগ: কাদের
  • ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হার্ডলাইনে যাবে বিএনপি
রোববার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ ০১:৫৫:৩৬ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

এরাও মানুষ

 

জীবনে প্রথমবার যখন বিদেশে গিয়েছি, আমি তখন বুয়েটের ফার্স্ট ইয়ারের শিক্ষার্থী। আমরা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের একটা দল গিয়েছিলাম জাপানে। বুয়েট থেকে আমি একা। আমার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন, ঢাকা মেডিকেল আর সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিলে মনে হয় দুজন। দলের মধ্যে আমি সর্বকনিষ্ঠ। তাও আবার প্রথমবার বিদেশ যাত্রা। তবে আমি একদম চিন্তিত নই, বরং আনন্দে ভাসছি। জাপান সরকারের আমন্ত্রণে তাদেরই খরচে বিদেশে যাচ্ছি।
টোকিও বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই আমি ক্ষণে ক্ষণে মুগ্ধ হচ্ছি। আমাদের জন্য ঠিক করা ছিল গিঞ্জা দ্য ইচি হোটেল। সরকারি লোকজনই বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে করে আমাদের হোটেলে নিয়ে গেল। হোটেলে এসে রুম-লবি সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মুগ্ধতার পালাও এক পর্যায়ে শেষ হলো। ক্লান্ত হয়ে একসময় দেখলাম পেট জানান দিচ্ছে, কিছু খাওয়া দরকার। বড় ভাই-বোনেরা আছেন। আমার চেয়ে তারা অনেক জ্ঞানী। তারাই ব্যবস্থা করবেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি তিন-চারজন বাঙালি ভাই এসে হাজির। আমাদের দলের আলাল ভাইয়ের পরিচিত। সঙ্গে খাওয়া দাওয়ার বিশাল আয়োজন। আজও সেই কেএফসির স্বাদ মুখে লেগে আছে। এই নতুন ভাইয়েরা সবাই স্বল্পশিক্ষিত। সম্ভবত অবৈধভাবেই ছিলেন। স্থানীয় হোটেল, শপিং মল ও দোকানে কাজ করেন। এর আগে খুব যে এ ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয়েছে তা নয়। আমার কাছে কিছুটা নতুনই লাগছিল। তবে আমার চেয়েও করুন অবস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের আপুর। বেচারি এক সচিবের মেয়ে। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সেই ভাইদের সঙ্গে তাদের আঞ্চলিক টানের কথায় তাল মিলয়ে গল্প করলেন।
যে পনেরো দিন ছিলাম, আমরা পদে পদে এই ভাইদের মহিমা বুঝেছি এবং তাদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। জাপানের কিছুই আমরা চিনি না। যা কিছু খেতে যাই ভয়ানক গন্ধ লাগে। সবকিছুর আকাশছোঁয়া দাম। জাপানি সরকার যতই আতিথেয়তা করে তাদের দেশি খাওয়া খাওয়াক, আমাদের মনতো দূরের কথা, পেটও ভরে না। মাঝে মাঝে গন্ধে পেট মোচড় দেয়। বমি ভাব হয়। কোনোরকমে খাওয়ার ভান করি। তাই হা করে সারা দিন বসে থাকতাম এই ভাইয়েরা রাতে কখন খাওয়া নিয়ে আসবেন, সেই আশায়। দেশে কথা বলব, ফোন কার্ড কিনতে হবে, আছে আমাদের নতুন পাতানো ভাই। আমাদের নিয়ে দোকানে বেড়ানো, কাজ বাদ দিয়ে তাও করছেন ওই ভাইয়েরা।
ফিরে আসার ঠিক আগে আগে দাওয়াত দিলেন আমার বাবার বন্ধু টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসের ইকোনমিক মিনিস্টার। যদিও পৌঁছানোর পরপরই আমি তাকে জানিয়েছি। কিন্তু তিনি ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। তাই এত দিন সময় দিতে পারেননি। তার স্ত্রী দেশে। সেই অজুহাতে তিনি আমাকে একা দাওয়াত দিলেন। বাসায় গিয়ে দেখি রান্না করার তিন-চারজন মানুষ ও ড্রাইভার আছে, এলাহি ব্যাপার!
আমি চোরের মতো মাথা নিচু করে সেদিন সেই দাওয়াত থেকে ফিরেছি। আমার এত সচ্ছল আংকেল আমাদের ছয়জনকে একবেলা খাওয়াতে পারলেন না। অথচ ওই দরিদ্র মানুষগুলো পনেরো দিন ধরে প্রতিদিন আমাদের সবাইকে যথাসাধ্য আপ্যায়ন করে যাচ্ছেন। তাদের আচরণ ও কথায় এত সমীহ যে, আমার ভীষণ লজ্জা করত। দিনের ভেতর এক শ বার বলতেন, ‘আপনারা দেশের প্রতিনিধি হয়ে আসছেন, আপনাদের একটু সেবাযত্ন করতে পারতেসি, এইটা তো আমাদের সৌভাগ্য।’
যত দূর মনে পড়ে আসার আগে আলাল ভাইয়ের হাতেই দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের জন্য টাকা ও উপহার পাঠিয়েছিলেন সবাই। কিন্তু খুব অবাক হয়েছি, যখন আমাদের মতো স্বল্পপরিচিত মানুষদের জন্যও তারা অনেক উপহার নিয়ে এসেছেন। জাপানে জিনিসের তখন যা দাম, কে জানে কত দিনের বেতনের অর্থ তাদের খরচ করতে হয়েছে। আমাদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতেন, মনে হতো যেন আমাদের মাঝে তারা দেশে ফেলে আসা ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজনকে দেখতে পাচ্ছেন। তারা দেশে যেতে পারেন না, কেউ টাকার অভাবে, কেউ আইনের প্যাঁচে। তবু বুকের মাঝে গভীর মমতায় ধরে রেখেছেন বাংলাদেশ।

আরো খবর